লবন পানির আগ্রাসনে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে কয়রার নারীরা

# আজ (৮ মার্চ) আর্ন্তজাতিক নারী দিবস #
রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) ঃ আবহাওয়ার সাথে খাপ না খাওয়ায় উপকুলীয় অঞ্চলে নারীরা রয়েছে প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুকিতে। আর্ন্তজাতিক নারী দিবসে এই অঞ্চলের নারীদের স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষায় কার্যকরি ব্যাবস্থা গ্রহন করা এখন সময়ের দাবিতে পরিনত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়, দুর্যোগ, আবহাওয়া পরিবর্তনের মতো সব সময় ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান, এমন নয়। নারীর ওপর রয়েছে এর বহুমুখী প্রভাব। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি নারীর আর্থিক, সামাজিক, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, যা পুরো সমাজকে প্রভাবিত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পুরুষের চেয়ে নারীর স্বাস্থ্যগত সমস্যা বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে উপকূলীয় নদী তীরবর্তি অঞ্চলের নারীরা বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হন। উপকূলীয় এলাকার নারীরা লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে জরায়ুর মতো জায়গায় জটিল রোগে ভুগছেন। কয়রা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে ঘুরে একাধিক শ্রমজীবি নারীর সাথে কথা বললে এমন চিত্র বেরিয়ে এসছে। তারা বলেন, লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে নারীর গর্ভপাতের হার বেড়েছে। খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলার নারীরা অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে নারীর জরায়ু রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন খিঁচুনি, অপরিকল্পিত গর্ভপাত, এমনকি অপরিণত শিশু জন্মের হার বেড়েছে। এ ছাড়া এ অঞ্চলের নারীরা দৈনন্দিন কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে লিকোরিয়া অর্থাৎ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগসহ চর্মরোগে ভুগছেন। কয়রা উপজেলা জলবায়ু পরিষদের সদস্য নিরাপদ মুন্ডা বলেন,‘উপকূলীয় এলাকায় জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রায় ৫০ শতাংশ নারীর বেশির ভাগ সময় নদীতে মাছ ধরা কাজ সহ ঘেরের পানিতে কাটাতে হয়। তাদের উপার্জনের একমাত্র পথ নদীতে জালটানা ও মাছের ঘের, যেখানে লবণ পানির পরিমাণ বেশি। দিনের বেশির ভাগ সময় লবণাক্ত পানিতে অতিবাহিত করার জন্য তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রা বেড়েছে। এ ছাড়া সচ্ছলতা না থাকায় তারা নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে পারেন না। ফলে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে, বাড়ছে মানসিক সমস্যাও। তিনি আরও বলেন, ‘নারীর আর্থিক সচ্ছলতার জন্য বিভিন্ন ধরনের কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে ধীরে ধীরে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব। তা ছাড়া আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় তারা শিক্ষার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়ছেন। কয়রা উপজেলা শিশু সুরক্ষা কোয়ালিশনের সভাপতি কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ, ব, আঃ মালেক বলেন, এই অঞ্চলের আবহাওয়ার গড় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়ায় মানুষ নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। বিশেষ করে, কিশোরী ও নারী, যাদের বয়স ১২-৪৫ বছরের মধ্যে, তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি দেখা যায়। ঋতুস্রাবের সময় থেকে শুরু করে মেনোপোজের সময় দেখা দেয় স্বাস্থ্যজনিত নানা সমস্যা। যেমন– পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা, অনিরাপদ প্রসব, অপরিণত শিশু প্রসব, খিঁচুনি ও অনিয়মিত ঋতু¯্রাব। উত্তর বেদকাশি বতুল বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি উম্মেহানী আক্তার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকুলীয় অঞ্চলের নারীর মধ্যে দেখা দেয় পুষ্টিহীনতা। প্রায় সময় নারীর মধ্যে অনিয়মিত ঋতু¯্রাব, জরায়ুতে সিস্ট, অসময়ে মেনোপোজসহ প্রজনন স্বাস্থ্যের নানা জটিলতা। কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারী ও কিশোরীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা পরিত্রানের প্রজেক্ট অফিসার মোঃ আলাউদ্দিন বলেন, শারীরিক স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নারী বা কিশোরী যখন প্রজনন স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভোগে, সে ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রন্ত হয়। পরিবারে হঠাৎ আর্থিক বিপর্যয় নেমে আসার কারণে নারী বিষœ্নতা এবং উদ্বিগ্নতায় দিন অতিবাহিত করে থাকেন। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মানসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়ে নারীদের সচেতনতা করতে পারলে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয় কিছুটা সমস্যা দুর করা সম্ভব। কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ সুজিত কুমার বৈদ্য বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে, এতে শরীরে অতিরিক্ত ঘাম হওয়ায় পানিশূন্যতা দেখা দিচ্ছে। হরমোনের তারতম্যের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্তের শিকার হচ্ছে নারী ও কিশোরীরা।



