খুলনার বাজারে কলার দাম আকাশচুম্বি!

# অতি মুনাফা লাভের আশায় অসাধু ব্যবসীদের সিন্ডিকেট #
# সেহ্রী ও ইফতারীতে কলার বেশি চাহিদা থাকায় দাম বাড়তি অভিযোগ #
# মাহে রমজানের পূর্বে সল্প বিনিয়োগে কেনা বাগান এখন অধিক লাভে বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা
# নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের দাবি সাধারন ক্রেতাদের #
মোঃ আশিকুর রহমান ঃ শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং বাড়তি পুষ্টির আশায় সারা বছরই খুলনার বাজারে ফলের চাহিদা লেগেই থাকে। পবিত্র মাহে রমজানে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারির নানা আয়োজনের মধ্যে ফল একটি বড় জায়গা দখল করে রাখে। তাই রমজানে প্রায় শতভাগ রোজাদাররা সেহ্রী ও ইফতারে কলাকে বেছে নেওয়ার দরুন, খুলনার বাজারে কদর বেড়েছে কলার। বর্তমানে খুলনার বাজারে কাবলী, কাঁঠালী, সাগর, চাপা, শবরী কলা, ও ঠোঁটে কলা দৃশ্যমান হচ্ছে। প্রতিদিনই খুলনার বাইরের জেলা শহর মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা ঈশ^রদী, যশোর অঞ্চলের সাদ্দাপপুর, খালিশপুরসহ খুলনার স্থানীয় অঞ্চল হতে খুলনার বাজারে আগমন ঘটছে নানা জাতের কলার।
শনিবার (৮ মার্চ) খুলনার পাইকারি ও খুচরা কলা বাজার ঘুরে আড়ৎদার, খুচরা ব্যবসায়ী ও সাধারন ক্রেতাদের সাথে কথা বলে নানা বিষয়ে জানা গেছে। বাজারে আসা সাধারন ক্রেতা বলছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট রমজান এলেই অসাধু ব্যবসায়ীরা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এদের নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ হয় বাজার মনিটরিংয়ে থাকা সংস্থাগুলো। সারা বছর কলার চাহিদা থাকলেও রমজান এলে সেহরী ও ইফতারকে ঘিরে কলার চাহিদা বহুগুণে বেড়ে যায়। আর এই সুযোগ কাজে লাগায় অসাধু ব্যবসায়ীরা। বর্তমান বাজারে ৫/৬ টাকা নীচে কোনো কলা নেই। আর ভালো মানের কলা কিনতে গেলে ৭/১০ টাকার নিচে পিস কেনা যােেচ্ছ না। ক্রেতাদের বিপরীতে কলা ব্যবসায়ীরা বলছেন, মুকামে বর্তমানে কলার দাম বেশি। চাহিদার তুলনায় ফলন কম। বাড়তি লাভের আশায় রমজানের এক বা দেড় মাস আগে থেকে বাগান মালিকেরা কলা কাটেনি। যে কারণে রমজানের শুরুতে সরবরাহ কমে গেছে কলার। এছাড়া রমজান আসার পূর্বে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী পূর্ব থেকে সল্প পুজি বিনিয়োগ করে বাগান কিনে রেখেছে। তারা এখন অতিরিক্ত লাভে বাগান থেকে কলা বিক্রি করছে। এভাবে বাগান থেকে মোকাম, মোকাম থেকে আড়ৎ, আড়ৎ থেকে খুচরা বাজার এবং খুচরা বাজার থেকে ভোক্তা পর্যায়ে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। একই সাথে উচ্চ লাভের আশায় রাজধানীসহ বড় বড় জেলা শহর গুলোতে বিক্রি করছে বাগান মালিকেরা। যে কারণে খুলনায় কলার আমদানী কম। এসব সার্বিক কারনে কলার দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে খুলনার বাজারে, সুতারং যে দামে কেনা পড়ছে, খরচ-খরচা বাদে সামান্য লাভে বিক্রি করা হচ্ছে বলে দাবি খুলনার পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের।
শনিবার (৮ মার্চ) পাইকারি কলা বাজার ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সাাথে কথা বলে জানা গেছে, কাবলী কলা মানভেদে প্রতি ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৮০০ টাকা, কাঁঠালী কলা মানভেদে প্রতি ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে ৪০০-১০০০ টাকা, সাগর কলা মানভেদে প্রতি ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে ৩০০-১০০০ টাকা, চাপা কলা মানভেদে প্রতি ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে ১৫০- ৮০০ টাকা, শবরী কলা কলা মানভেদে প্রতি ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০০-১০০০ টাকা ও ঠটে কলা কলা মানভেদে প্রতি ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে ৩০০-১০০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন দৌলতপুর বিএল কলেজ সংলগ্ন পাইকারি কলা বিক্রেতা (আড়ৎদার) সানি-জনি এন্টার প্রাইজের সত্ত্বাধিকারী মার্জিনা বেগম। কলা কিনতে আসা ক্রেতা সোহেল রানা জানান, রোজা আসলেও কলার, শষা, খিরাই’র গায়ে যেন আগুন লাগে। সারা বছরই কলা চাহিদা থাকে। তবে রমজানে সেহরী ইফতারে কলা চাহিদা বহুগুনে বৃদ্ধি পায়। আর এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারন মানুষকে জিম্মি করে কলার দাম বৃদ্ধি করে। বর্তমান বাজারে ৫/৬ টাকার নিচে কোনো কলা নেই। ভালো মানের কলা কথা ভাবাতো পাপ, ৮-১০ টাকার নিচে কোনো কলা নেই। নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা প্রয়োজন বলে মনে করি।
কলা কিনতে আসা ক্রেতা কলেজ ছাত্র পায়েল জানান, ১৫ রোজার পর বাড়ীতে যাবো। তার আগ পর্যন্ত ম্যাচে থেকে রোজা রাখছি। সেহরী করার সময় দুধ কলা বাধ্যতামূলক। কারণ সারাদিন পেট ঠান্ডা থাকে। কিন্তু কলার যে অবস্থা, যে দাম, মাথায় নষ্ট। রোজার আগে যে কলার দাম ছিল, ৪/৫ টাকা, তা বর্তমানে ৬/৮ টাকার নিচে বিক্রি হচ্ছে।
রিক্সা চালক সিরাজুল জানান, আমাদের মতো অনেক গরিব মানুষ আছে, যারা কলা পানি দিয়ে ভাত মাখিয়ে খেয়ে রোজা রাখে। কিন্তু বর্তমানে কলা যে দাম, বাবা রে বাবা। ৫/৬ টাকা প্রতি পিস কলার দাম। অবশেষে কলার কথা মাথা থেকে সরিয়ে ১ কেজি গুড় কিনেছে। এখন ছেলে মেয়ে দুধ-কলার পরিবর্তে গুড় দিয়ে খেয়ে রোজা রাখছে।
খুচরা কলা বিক্রেতা মো. ইফরাফিল মোড়ল জানান, পাইকারি বাজার থেকে যে দামে কলা কিনি, সামান্য লাভে বিক্রি করি। এবছর প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারনে, বিশেষ করে কয়েক মাস আগে ঝড়ের কারণে কলা বাগান নষ্ট হয়। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ফলন কম, থাকায় মুকামে দাম বাড়তি।
অপর খুচরা কলা বিক্রেতা আশরাফ জানান, চাহিদা তুলনায় কলার ফলন কম। তাছাড়া রমজান এলেই কলা চাহিদা বাড়ে। মোকাম কলার দাম বাড়তি। যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। আমরা যে দামে কিনি খরচ-খরচা বাদে সামান্য লাভে বিক্রি করি। সারা বছর সব পণ্যেই ক্রেতাদের হাতের নাগালে থাক এমন প্রত্যাশা করি।
পাইকারি কলা বিক্রেতা (আড়ৎদার) সানি-জনি এন্টার প্রাইজের সত্ত্বাধিকারী মার্জিনা বেগম জানান, মোকামে বর্তমানে কলার দাম বেশি। চাহিদার তুলনায় ফলন কম, বাড়তি লাভের আশায় রমজানের এক বা দেড় মাস আগে থেকে বাগান মালিকেরা কলা কাটেনি। যে কারণে রমজানের শুরুতে সরবরাহ কমে গেছে কলার। এছাড়া রমজানকে সামনে রেখে যে সকল ব্যবসায়ী পূর্ব থেকে স্বল্প পুঁিজ বিনিয়োগ করে বাগান কিনে রেখেছে। তারা এখন অতিরিক্ত লাভে বাগান থেকে কলা বিক্রি করছে। একই সাথে উচ্চ লাভের আশায় রাজধানীসহ দেশের বড় বড় জেলা শহর গুলোতে কলা বিক্রি করছে বাগান মালিকেরা। যে কারণে খুলনায় কলার আমদানী কম। এসব সার্বিক কারনে কলার দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে খুলনার বাজারে। এ ব্যাপারে খুলনা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষন অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক খালিদ বিন ওয়ালিদ জানান, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রনে আমাদের নিয়মিত বাজার তদারকি ও অভিযান অব্যহত রয়েছে। ভোক্তাদের অধিকার লঙ্ঘিত করা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। যেহেতু কলার দাম বাড়তি বিষয়ে বলা হয়েছে, এ ব্যাপারে তদারকি পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহন করবো।



