খুলনায় ব্যবসায়ীসহ দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতারণার মামলা

# চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে প্রায় ৬ কোটি
টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার ঃ খুলনায় ব্যবসায়ী তাপস কুমার সাহা ও দুই সহোদর চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে প্রায় ৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ১৩ এপ্রিল মোংলার দিগরাজ এলাকার ভূমি ব্যবসায়ী মো. আব্দুল মোমিন বাদী হয়ে বাগেরহাটের বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে এ প্রতারণা মামলাটি দায়ের করেন। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. এনামুল হোসেন। মামলার ধারা-৪২০/৪০৬/৩৪ দঃ বিঃ। আদালত আসামীদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন।
মামলায় বলা হয়েছে, বাদী আব্দুল মোমিন দীর্ঘদিন যাবত মোংলা উপজেলার দিগরাজ এলাকায় জমি ক্রয়-বিক্রয় করে আসছিলেন। খুলনা মহানগরীর ফারাজীপাড়া এলাকার মৃত ডা. এ.এফ.এস বাদশা মিয়া’র ২ ছেলে ডা. আব্দুল কাইয়ুম শেখ (৫৮) ও ডা. শেখ মো. রেজওয়ান (৫২) ওয়ারেশ ও ক্রয় সূত্রে মালিকানাধীন স্থানীয় বিদ্যার বাওন মৌজার জমি বাদী আব্দুল মোমিনের ব্যবসায়ী পার্টনার রামপাল উপজেলার শিবনগর এলাকার মৃত আব্দুল বারিকের ছেলে মুহাম্মাদ আব্দুল আলিমের মাধ্যমে জমি বাদীর কাছে বিক্রয়ের প্রস্তাব করলে বাদি জমিটি সরেজমিনে দেখতে চান। তখন ১ ও ২ নং আসামী ১ নং স্বাক্ষী আলিমকে সঙ্গে নিয়ে বাঁদিকে উক্ত সম্পত্তি দেখানো হয়। বাদীর জমি পছন্দ হওয়ায় বাদী উক্ত জমির মালিকানা কাগজপত্র দেখতে চান। তখন আসামী ডা. আব্দুল কাইয়ুম শেখ ও ডা. শেখ মো. রেজওয়ান তাদের মালিকানা সক্রান্ত সকল কাগজপত্র দেখান এবং দলিলের ফটোকপি বাদীর কাছে হস্তান্তর করেন। কিন্তু বাদী আসামীদ্বয়ের নামে উক্ত জমির পর্চা চাইলে আসামীদ্বয় তাদের নামে সকল জমি মিউটেশন করে পর্চা দিবেন বলে জানায়। আসামীদের সাথে বাদী এই কথাবার্তার পরে জমির মূল্য জানতে চাইলে আসামীদ্বয় ৩নং আসামী মহানগরীর সাউথ সেন্ট্রাল রোড এলাকার মৃত সুনিল কুমার সাহার ছেলে তাপস কুমার সাহা (৪৬) এর সাথে আলোচনা করে জমির মূল্য ২৪ কোটি টাকা দাবি করেন। তখন ১নং স্বাক্ষী ব্যবসায়ী পার্টনার আব্দুল আলিমের মাধ্যমে ১-৩ নং আসামীর সাথে দেন দরবার করে সর্বশেষ ওই জমির মূল্য ১৯ কোটি টাকা ধার্য করা হয়। তখন ১ ও ২ নং আসামী বাদীকে জানান, জমির মিউটেশন করতে যে সময় লাগবে সেই সময় পর্যন্ত বাদী জমিটি ভোগ দখল করবেন এবং আসামীদেরকে অগ্রিম বাবদ নগদ ১ কোটি টাকা প্রদান করতে হবে। তখন বাদী তার অপর ব্যবসায়ি পার্টনার মো. পাভেল পাশার সঙ্গে আলোচনা করে আসামীদের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে সরল বিশ্বাসে অগ্রিম কোন লিখিত চুক্তি বা ডকুমেন্ট ছাড়া ১ কোটি টাকা দিতে সম্মত হন। আসামীদের প্রস্তাব অনুযায়ী বাদী ও তার পার্টনার ২নং স্বাক্ষী পাভেল পাশা ও পার্টনার ১নং সাক্ষীর সাথে আলোচনা করে ২নং স্বাক্ষীর পার্টনার মো. সাহা নেওয়াজ আলম ও মঞ্জুর আহমেদের যৌথ একাউন্ট (রূপালী ব্যাংক লিমিটেড, খুলনা শাখা) থেকে ২নং আসামীর আইএফআইসি ব্যাংক লিমিটেড খুলনা শাখায় ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী ৩০ লাখ টাকা প্রদান করে। পরবর্তীতে বাদী নিজে ওই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারী থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত মোট ৪ দফায় ভিন্ন ভিন্ন তারিখে বাদীর আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক পি এল সি দিগরাজ বাজার সাব ব্রাঞ্চ থেকে ২নং আসামীর আই এফ আই সি ব্যাংক লিমিটেড অ্যাকাউন্টে ৬ মার্চ পর্যন্ত ৭০ লাখ টাকা প্রেরণ করেন। সর্বমোট ১ কোটি টাকা ২ নং আসামীর একাউন্টে প্রদান করা হয়। এমনকি বাদী ওই জমি দখলে নিয়ে ১নং স্বাক্ষী আলিমের সহায়তায় জমি সংস্কার করে মৎস্য প্রজেক্ট তৈরি করে বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি ও সাদা মাছের পোনা ছেড়ে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮২০ টাকা বিনিয়োগ করেন। সেইসাথে ওই সম্পত্তিতে বিভিন্নভাবে উন্নয়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন। কিছুদিন পর ১ ও ২ নং আসামী সম্পত্তির লোন পরিশোধ করার কথা বলে আরো ৫ কোটি টাকা দাবী করেন। তখন বাদী ও ২ নং স্বাক্ষীর সাথে ওই বছরের মার্চ মাসে ৩’শ টাকার নন জুডিসিয়াল স্টাম্পে বায়না চুক্তিপত্র হয়। উক্ত চুক্তিপত্রে ২১ আগষ্টের মধ্যে আরো ৫ কোটি টাকা পরিশোধের কথা যুক্ত করা হয়। কিন্তু উক্ত বায়না চুক্তি পত্রের ১৩ নং শর্তানুযায়ী আলোচনা করে লিখিত আবেদনের মাধ্যমে ১ ও ২ নং আসামীর কাছ থেকে সময় নেওয়া হয়। আসামীদের সাথে বাদীর কথা থাকে যে, তফশিল বর্ণিত সম্পত্তির মিউটেশন কমপ্লিট হওয়ার পরে বাকি ১৮ কোটি টাকা গ্রহণ করে জমি রেজিস্ট্রি করে দিবেন। কিন্তু আসামীগণ তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি ১৭ সেপ্টেম্বর নিজেদের নামে মিউটেশন প্রাপ্ত হন। কিন্তু আসামীদ্বয় মিউটেশনের বিষয় বাদী ও বাদীর পার্টনার পাভেল পাশা ও ১ নং সাক্ষী আলিমকে অবহিত করেননি। পরবর্তীতে ১ ও ২ নং আসামী ৩ নং আসামি তাপস কুমার সাহার সাথে যোগসাজসে বাদী ও তার পার্টনার পাভেল পাশার সাথে কোন আলোচনা ছাড়াই বাদী ও ২নং স্বাক্ষীকে উক্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে চুক্তির সকল শর্ত ভঙ্গ করে এবং বাদী ও বাদীর পার্টনার পাভেল পাশার কাছ থেকে নেওয়া ১ কোটি টাকা ও বাদীর বিনিয়োগকৃত ৪কোটি ৮২ লাখ ৮২০ টাকা আত্মসাৎ এর উদ্দেশ্যে ৩নং আসামীর নামে তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি চলতি বছরের ১৮ মার্চ রেজিস্ট্রি করে দেন। তারপর ৩ নং আসামী ১ ও ২ নং আসামীকে সঙ্গে নিয়ে এ বছরের ২০ মার্চ বাদীর দখলকৃত তফসিল বর্ণিত জমিতে যান। তখন বাদি জমি পরিদর্শনের কারণ জিজ্ঞাসা করলে ৩ নং আসামী তাপস সাহা জানান, তিনি উল্লেখিত সম্পত্তি ১ ও ২ নং আসামীর নিকট থেকে ১৮ মার্চ সাফ কবলা রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। তখন বাদী হতভম্ব হয়ে বাদী ও বাদীর পার্টনার মো. পাভেল পাশার নামে সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে না দিয়ে ৩নং আসামী তাপস কুমার সাহা’র নামে সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে ১-২ নং আসামী বাদীকে কোন সন্তোষজনক জবাব প্রদান করেননি। এ অবস্থায় বাদী তার দেওয়া নগদ ১ কোটি টাকা ও ১ ও ২নং আসামীদ্বয়ের কথা অনুযায়ী সম্পত্তিতে বিনিয়োগকৃত সম্পূর্ণ টাকা ফেরত চাইলে আসামীরা উক্ত টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। ১-৩ নং আসামি পরস্পর যোগসাজসে একে অন্যের সহায়তায় বাদীর কাছ থেকে নেওয়া নগদ ১ কোটি টাকা ও আসামীদের কথা অনুযায়ী বাদীর বিনিয়োগকৃত সম্পত্তিতে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮২০ টাকা সর্বমোট ৫ কোটি ৮২ লাখ ৮২০ টাকা প্রতারণামূলকভাবে বিশ্বাস ভঙ্গ করে আত্মসাৎ করেছে। উল্লেখিত বিষয় নিয়ে বাদী চুক্তির শর্ত অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠকের প্রস্তাব দিলে আসামীগণ তা প্রত্যাখ্যান করেন। তখন বাদি স্থানীয়ভাবে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় বিষয়টি মীমাংসা করতে ব্যর্থ হয়।
এব্যাপারে বাদী পক্ষের আইনজীবী মো. এনামুল হোসেন বলেন, আদালত মামলাটি গ্রহণ পূর্বক আদালতে হাজির হওয়ার জন্য আসামীদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন।
এবিষয়ে মামলার বিবাদী জমি বিক্রেতা ডা. আব্দুল কাইয়ুম শেখ বলেন, শর্তানুযায়ী নগদ ১ কোটি টাকা এবং ৬ মাসের মধ্যে মর্টগেজ বাবদ ব্যাংকে আরও ৫ কোটি টাকা প্রদানের কথা ছিলো। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বায়না গ্রহিতা পক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এজন্য তারা তৃতীয় পক্ষের কাছে জমিটি বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে জমির দখল এখনও বায়না গ্রহিতা আব্দুল মোমিনের অধীনে রয়েছে। এমনকি তাদের প্রদানকৃত অগ্রিম ১ কোটি টাকাও তিনি ফেরত দেননি বলে স্বীকার করেন।
এবিষয়ে জমি ক্রেতা নগরীর ১৬/১ সাউথ সেন্ট্রাল রোডস্থ তাপস কুমার সাহা’র বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি জানতে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি সংবাদ কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে চাননি।



