স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় চলছে বালু মহল ইজারার নামে হরিলুট

# হাইড্রো গ্রাফিক জরিপের সাথে থাকে না ইজারার মিল #
# ২৭ লাখ টাকার রাজস্ব আদাই করতে গিয়ে শতকোটি টাকার বেড়িবাঁধ ক্ষতি হচ্ছে #
# বিল ডাকাতিয়া বালি পড়ে নদিগুলো ভরট হয়ে যাচ্ছে। সেখানে ইজারা না দিয়ে ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় ইজারা দেওয়া হচ্ছে

আনিছুর রহমান কবির ঃ বালু মহল ইজারা মানেই কোটি কোটি টাকার স্বপ্ন। আর এ স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে শহর রক্ষা বাঁধের কাছে নিয়ম বহির্ভূত বালু উত্তোলন করায় শহর রক্ষা বাঁধসহ নদী প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। বালু মহল ইজারার নামে খুলনা প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের শতকোটি কোটি টাকায় নির্মিত শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে এবং অনেক বাঁধ হুমকির মুখে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে যত্রতত্র এ সকল বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আগের শেখ বাড়ির ক্ষমতায় ইজারার নামে হরিলুট হয়েছে। অথচ যে পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হয় সারা বছর এ সকল বালুর হিসাব যদি প্রশাসন রাখতো তাহলে কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হত বলে দাবি নাগরিক নেতাদের। সাধারণ মানুষের দাবী বালু মহল ইজারার নামে এ সকল হরিলুট বন্ধ হওয়া উচিত। অথচ প্রতিবছর পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ করা হয়, যে জরিপের সাথে গত পাঁচ বছরের জেলা প্রশাসক কর্তৃক ইজারার সাথে কোন মিল নেই। বটিয়াঘাটা উপজেলার এ জলমহল নিয়ে প্রতিবছরই হয়ে থাকে হরিলুট। ইতিপূর্বে শেখ বাড়ির ইশারায় এ সকল বালু মহলের এ ইজারা নামে মাত্র হলেও চলতি বছরে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মহলের ছত্রছায়ায় সেই একই পথে হাঁটতে চলেছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে ২ কোটি ২৬ লক্ষ ২ হাজার ১৬৪ টাকার চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২৭ লক্ষ ৭২ হাজার টাকার ইজারা হয়। চলতি বছর বাংলা ১৪৩২, ইংরেজি ২০২৫ সালের বটিয়াঘাটা উপজেলার চারটা মৌজায় বালুমহল ইজারায় হাইড্রোগ্রাফিক জরিপে ১০ কোটি ৫০ লক্ষ ৪ হাজার ৫৫১.৯৮ ঘনফুট বালুর চাহিদা দেখানো হয়,যার বাজার মূল্য ধরা হয়েছ ৭ কোটি ৮৭ লক্ষ ৮ হাজার ৪১৩ টাকা। যার টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান। তবে চলতি বছর ইজারার বিপরীতে ২৮ টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে চলেছে। এছাড়া বাংলা ১৪২৬, ইংরেজি ২০১৯ সালের বটিয়াঘাটা উপজেলার বালুমহল ইজারায় কোন প্রকার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ছাড়াই মাত্র ৩ লক্ষ ৬১ হাজার ২০০ টাকায় ইজারা প্রদান করা হয় । বাংলা ১৪২৭, ইংরেজি ২০২০ সালের বটিয়াঘাটা উপজেলার বালুমহল ইজারায় ও কোন প্রকার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ছাড়াই মাত্র ১২ লক্ষ ১ হাজার ২০০ টাকায় ইজারা প্রদান করা হয় ইজারা প্রদান করা হয়।
বাংলা ১৪২৮, ইংরেজি ২০২১ সালের বটিয়াঘাটা উপজেলার বালুমহল ইজারায় হাইড্রোগ্রাফিক জরিপে ২ কোটি ৫৬ লক্ষ ২৯৪.৭৫ ঘনফুট বালুর চাহিদা দেখানো হয়, যার বাজার মূল্য ছিল ১ কোটি ৪০ লক্ষ ৮২ হাজার ৯১১ টাকা অথচ ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৩ লক্ষ ২৬ হাজার টাকায়। যা ১ কোটি ২৭ লক্ষ ৫৬ হাজার ৯১১ টাকা কমে যারা প্রদান করা হয় অথচ চাহিদার তুলনায় প্রায় শত গুণ বেশি বালু উত্তোলন করা হয়েছে। বাংলা ১৪২৯, ইংরেজি ২০২২ সালের বটিয়াঘাটা উপজেলার বালুমহল ইজারায় হাইড্রোগ্রাফিক জরিপে ২ কোটি ৫৬ লক্ষ ২৯৪.৭৫ ঘনফুট বালুর চাহিদা দেখানো হয়, যার বাজার মূল্য ছিল ১ কোটি ৪০ লক্ষ ৮২ হাজার ৯১১ টাকা অথচ ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৪ লক্ষ ৬১ হাজার ২০০ টাকায়। যা ১ কোটি ১৬ লক্ষ ২১ হাজার ৭১১ টাকা কমে যারা প্রদান করা হয় অথচ চাহিদার তুলনায় প্রায় শত গুণ বেশি বালু উত্তোলন করা হয়েছে। রহস্যজনকভাবে দুই বারই একই চাহিদা দেখানো হয়েছে। বাংলা ১৪৩০, ইংরেজি ২০২৩ সালের বটিয়াঘাটা উপজেলার বালুমহল ইজারায় হাইড্রোগ্রাফিক জরিপে ৩ কোটি ২৬ লক্ষ ৬৮ হাজার ৪৮৫.০৬৫ ঘনফুট বালুর চাহিদা দেখানো হয়,যার বাজার মূল্য ছিল ১ কোটি ৭৯ লক্ষ ৬৭ হাজার ৬৬ টাকা অথচ ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৬ লক্ষ ২৬ হাজার ২৫০টাকায়। যা ১ কোটি ৫৩ লক্ষ ৪১ হাজার ৪১৬ টাকা কমে যারা প্রদান করা হয় অথচ চাহিদার তুলনায় প্রায় শত গুণ বেশি বালু উত্তোলন করা হয়েছে।
বাংলা ১৪৩১, ইংরেজি ২০২৪ সালের বটিয়াঘাটা উপজেলার বালুমহল ইজারায় হাইড্রোগ্রাফিক জরিপে ৪ কোটি ১০ লক্ষ ৯৪ হাজার ৮৪৩.৯৯ ঘনফুট বালুর চাহিদা দেখানো হয়,যার বাজার মূল্য ছিল ২ কোটি ২৬ লক্ষ ২ হাজার ১৬৪ টাকা অথচ ইযারা দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৭ লক্ষ ৭২ হাজার টাকায়। যা ১ কোটি ৯৪ লক্ষ ৩৯ হাজার ১৬৪ টাকা কমে যারা প্রদান করা হয় অথচ চাহিদার তুলনায় প্রায় শত গুণ বেশি বালু উত্তোলন করা হয়েছে। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা বলেন, বিল ডাকাতিয়ার দশ গেটের সামনে থেকে ভালো উত্তোলন করা খুবই জরুরী অথচ সেখানে না দিয়ে একই জায়গা থেকে প্রতিবছর ইজারা দেয়া হচ্ছে বালি উত্তোলনের। যে সকল নদীগুলো বালুর পরে মরে গিয়েছে সেই সকল নদীগুলো থেকে বালু উত্তোলন করলে একদিকে যেমন সরকারের খরচ কমবে অন্যদিকে এ জেলার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হবে। অথচ দশ গেটের এখান থেকে বালু উত্তোলন করতে এ সরকারের কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এ বিষয়ে বটিয়াটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসনে আরা তন্বী বলেন, আমরা এ সকল অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আপনাদের কাছে কোন তথ্য থাকলে দেন আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করব এ বিষয়ে স্থানীয় এক বালু ব্যবসায়ী বলেন, ইজারাতো হয় ভাই শুধু নামে, যে পরিমাণ বালু ওঠার কথা থাকে সে পরিমাণ বালি সর্বোচ্চ থেকে ২ থেকে ৩ মাস লাগে উঠাতে । অথচ এরা সারা বছরই বিভিন্ন জায়গা থেকে বালু তোলে। আমরা ব্যবসায়ী যারা এই ইজারা নিয়ে থাকি তারা আমাদের কাছে বিক্রি করে আমরা কিনে রাখি। প্রশাসনের লোকজন সবই জানে বোঝে কিন্তু কেন তারা দেখে না, তা আপনিও জানেন আমিও জানি কিন্তু বলতে পারি না। এ বিষয়ে সুমন ছদ্মনামে এক ব্যবসায়ী বলেন আগে শেখবাড়ি যা বলতো তাই হত এখন কাদের ইশারায় চলছে জানিনা ভাই বলে আবার বিপদে পড়বো। আমাদের ব্যবসা করে খেতে হবে। এবিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে শহর এবং শহর রক্ষা বাঁধের কাছাকাছি কোথাও কোন বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না, এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত বিশেষজ্ঞদের দিয়ে হাইড্রোগ্রাফিক টেস্ট করে সীমানা নির্ধারণ করা উচিৎ। সহকারী কমিশনার (ভূমি) শরীফ শাওন বলেন, অন্যান্য বছরগুলোতে কোন প্রকার স্থান নির্ধারণ করা ছিল না এ কারণেই যত্রতত্রভাবে বালু উত্তোলন করতে পারত। কিন্তু চলতি বছর আমরা জেলা প্রশাসক ও বটিয়াঘাটা নির্বাহী কর্মকর্তা স্যারের নির্দেশ মোতাবেক পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ তিন থেকে চারটি সংগঠন একত্রিত হয়ে মৌজা এবং এলাকা আলাদা আলাদা ভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, এতে করে পূর্বের যে বিষয়গুলো হয়েছে সেগুলো হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এ বিষয়ে খুলনা নির্বাহী প্রকৌশলী, খুলনা পওর বিভাগ-২, বাপাউবো মোঃ আশরাফুল আলম বলেন, শহর রক্ষা বাঁধে পাশ থেকে বালি উত্তোলন করলে আমাদের বাঁধগুলো অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইজারা পূর্বে এ সকল বিষয়গুলো দেখা খুবই জরুরী বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা। এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব মো: আক্তার হোসেন বলেন, আমি নতুন আশায় বিগত বছরগুলোতে কিভাবে হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে এ বছর আমরা ওপেন টেন্ডারের ব্যবস্থা করেছি। প্রত্যেকটা উপজেলা জেলায় টেন্ডার বক্স থাকবে। এছাড়া যদি অন্য কোথাও রাখতে হবে টেন্ডার বক্স এমন কোন সুপারিশ যদি আছে আসে সে ব্যবস্থাও গ্রহন করব আমরা। এখানে টেন্ডারবাজি করার কোন সুযোগ থাকবে না এবং চাহিদার বিপরীতে সামঞ্জস্য রেখেই টেন্ডার হবে । বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় এবারের টেন্ডার হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button