স্থানীয় সংবাদ

খুলনা সার্কিট হাউজে ডেকে নিয়ে যাওয়ার রাত ছিল খুবই ভয়ংকর : আয়মান আহাদ

# সাক্ষাৎকার #

স্টাফ রিপোর্টার : স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলন-সংগ্রামে উত্তাল হয়ে উঠেছিলো সারাদেশ। কোটা সংস্কার আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও যার সমাপ্তি ঘটে স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের একদফার মাধ্যমে। সৃস্টি হয় নতুন বাংলাদেশের। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে লড়াই করেছিলেন এদেশের আপামর ছাত্র-জনতা। সেই আন্দোলনে নিজেদের জীবন বাজি রেখে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।
সেই সময় শিক্ষার্থীদের সংঘটিত করে আন্দোলন পরিচালনায় যেসব শিক্ষার্থী সম্মুখ সারিতে নেতৃত্ব দিতেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ ডিসিপ্লিনের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী এমডি আহাদ হোসেন (আয়মান আহাদ)।
বরিশাল জেলার মুলাদি উপজেলার বালিয়াতলি শফিপুর গ্রামের মৃত, আলমগীর মিয়ার সন্তান আয়মান আহাদ। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তিনি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের খুলনা মহানগরের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি তিনি সাক্ষাৎকারে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার নানা স্মৃতি বর্ণণা করেছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রায় এক বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে, জুলায়ের সেই সংগ্রামী সময়ের স্মৃতি এখনও অনুভব করতে পারেন কি-না? হ্যাঁ, অবশ্যই অনুভব করতে পারি। জুলাইয়ে সেই স্মৃতিগুলো এখনও মনে পড়ে। প্রতিমুহূর্তেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই স্মৃতিগুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে ৩০ জুলাই আমাদেরকে যখন সার্কিট হাউজে ধরে নিয়ে যায়। সেটা একটা ভয়ংকর ব্যাপার ছিলো। সেখানে নিয়ে শারীরিক আঘাত ছাড়া যত ধরনের গালিগালাজ হুমকি-ধামকি ও ভয়ভীতি দিয়ে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিতে বাধ্য করে প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের নেতারা। সেটা একটা ভয়ংকর রাত ছিলো। এ ঘটনা স্মৃতিতে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা আন্দোলনের সূত্রপাত কিভাবে হয়েছিলো? প্রথমে যখন আমরা দেখলাম যে, এটা জুলাইয়ে ৪ তারিখ ছিলো, আমরা তখন ক্লাস থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে প্রতিদিনের মতই বসি। তখন আমি, আজাদ, জহুরুল তানভীর, মুহিবুল্লাহ মুহিবসহ কয়েকজন আলোচনা করি যে, এমন একটি রায় হয়েছে যে, কোটা বহাল আছে। তখন আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারি- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলন শুরু হচ্ছে। তখন আমরাও তাৎক্ষনিক একটা ডিসিশন নিলাম যে, আমরাও এর প্রতিবাদে আন্দোলন করবো। এভাবেই শুরু হয় আন্দোলনের সূত্রপাত।
আপনি কি শুরুতেই জানতেন যে, এই আন্দোলন স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে রুপ নেবে? না, আমরা কখনও সেরকম ভাবিনি।প্রথম পর্যায়ে আমাদের চাওয়া ছিলো শুধু কোটা বাতিল। সরকার পতন বা এ ধরণের কোন চিন্তা ছিলো না। কিন্তু পরবর্তীতে যখন দেখলাম যে, আবু সাঈদ গুলির সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বুক পেতে নিজের প্রাণ উৎস্বর্গ করে, পরবর্তীতে ২০ জুলাই মুগ্ধ ভাই মারা যায়। মুগ্ধ ভাই মারা যাওয়ার পরে তখন ডিটারমাইন্ড হয়ে যাই, যে আর ফেরার আসলে কোন পথ নেই। হয় মরবো তা-না হলে দেশ স্বাধীন করবো। এ রকম একটা চেতনা আমাদের মধ্যে কাজ করে। বিশেষ করে যখন পুলিশের গুলিতে একের পর এক লাশ পড়ছে তখন আমাদের মধ্যে একটি বিষয় কাজ করে যে, ফ্যাসিবাদ সরকারের পতন ছাড়া ঘরে ফেরার আর কোন সুযোগ নেই।
আন্দোলনে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কেমন ছিল? শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ শুরু থেকেই স্বতস্ফূর্ত ছিল। সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা আমাদের সাপোর্ট এবং সহযোগিতা করেছে। তারা মিছিলে অংশ নিয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এবং আশেপাশের অন্যান্য স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে অংশ নেয়। এখানে সিনিয়র জুনিয়র সবাই ছিল। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দুই থেকে তিন হাজার শিক্ষার্থী আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করে।
ক্যাম্পাসে অহিংস কোটা সংস্কার আন্দোলন সহিংসতায় রুপ নিলো কিভাবে? প্রথমেই যদি বলি সহিংস রুপটা খুলনায় প্রথম শুরু হয় ৩০ জুলাই। আমরা ক্যাম্পাস থেকে কয়েকজন শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান করি। তখন ডিবির ডিসি নুরুজ্জামান এসে বলে আমাদের এখানে মিছিল করতে দেবে না। তখন আমি এবং অন্যান্য কলেজের আমার কয়েকজন জুনিয়র ছেলে-পেলে সামনে এগিয়ে গেলে ওদের গায়ে হাত তোলে। আমার পাশে হেলাল ভাই ছিলো উনার গায়েও হাত তোলে। পরে শাহরিয়ার ভাইও আসে। তখন আমি এগিয়ে গেলে তিনি কলার ধরে আমাকে ধাক্কা দেন। এছাড়াও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ করে দিয়ে জোর করে আমাদেরকে হল থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে আন্দোলন সহিংসতায় রুপ নেয়। এছাড়া মুগ্ধ ভাই মারা যাওয়ার পর আমরা সকল বাধা ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করি। এমনকি আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তালা ভেঙে প্রবেশ করি। পরবর্তীতে ৩১ জুলাই যখন আমরা সাতরাস্তা মোড়ে কর্মসূচি দিই, তখন সেখানে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে এবং পরবর্তীতে ২ আগষ্টও পুলিশ আমাদের কর্মসূচিতে হামলা চালায়। এভাবে মূলতঃ অহিংস আন্দোলন সহিংসতায় রুপ ধারণ করে।
আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা এবং হুমকি- সাধারণ শিক্ষার্থীদের কিভাবে প্রভাবিত করেছিল? অনেক বেশি প্রভাবিত করে ছিলো। আমার স্পষ্ট মনে আছে- যখন ১৬ জুলাই ছিলো, সেদিন রাতেও আমাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের ফোন আসে- যে ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা চালাবে। এজন্য সারারাত ঘুমাইনি। এভাবে ১৬ জুলাইয়ের পর থেকে অগনিত রাত আমাদের নির্ঘুম কেটেছে, যতদিন না ৫ আগষ্ট এসেছে, ততদিন আমরা ভয়ে থাকতাম- কখন না ছাত্রলীগের হামলা হয়। এছাড়া প্রশাসনের থেকেও থ্রেট পেতাম যে তারা বলত, আমরা আপনাদের সাবধান করছি, আপনারা হামলার শিকার হবেন। এভাবে অনেক ধরনের হুমকি ছিল। এসব হুমকির কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রথমে ভয় পেয়ে একটু নিজেদেরকে সংকুচিত করে রাখতো। পরে আমাদের ডাকে তারা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সাড়া দিয়েছে আর মুগ্ধ ভাই মারা যাওয়াটা সবার মধ্যে বিশেষ ভাবে এক ধরনের সাফ ফেলেছে। কারন : মুগ্ধ ভাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার কারনে শিক্ষার্থীরা বেশি উত্তেজিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সাথে আমাদের অগনিত স্মৃতি রয়েছে। তাই বিষয়টা কেউ মেনে নিতে পারিনি।
আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কেমন ছিল? নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮ জুলাই পর্যন্ত বেশ ভালো ছিল। তবে হল বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক দূর-দুরান্তের শিক্ষার্থীদের থাকার কোন যায়গা ছিল না, সেক্ষেত্রে তাদের অংশ গ্রহণ আস্তে আস্তে কমতে থাকে। তবে, খুলনার অন্যান্য স্কুল-কলেজ-জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান-স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের ধারাবাহিকতা কিভাবে চলমান ছিল? ধারাবাহিকতা বলতে গেলে প্রথমে ৪ জুলাই আমরা ডিসিশন নিই, পরবর্তীতে ৭ জুলাই আমরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম মানববন্ধন করি। এরপর ধীরে ধীরে আমরা ৮ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে জিরো পয়েন্টে মিছিল করি। পরবর্তীতে ১৬ জুলাই আমরা সাচিবুনিয়া মোড়ে আমরা ব্লক করি। পরবর্তীতে আমরা ডিসি বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করি। এটা ১৬ বা ১৭ তারিখের দিকে হবে। এরপর ১৮ তারিখ থেকে বিভাগীয় দপ্তরে গিয়েও কথা বলি। সেখানে আমরা আমাদের দাবির কথা জানাই। কিন্তু পরবর্তীতে ১৮ তারিখ হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় দুই অংশ স্টুডেন্ট চলে যায়। আমরা এমন কিছু স্টুডেন্ট ছিলাম যারা সম্মুখ সারির যোদ্ধা। হল ছেড়ে দিয়ে আমরা বিভিন্ন বন্ধুদের বাসায় থাকা শুরু করি। এরপর থেকে আমরা পরবর্তী প্রোগ্রামগুলো শিববাড়িতে ফেলি। শিববাড়িতে আমরা একটানা ২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রোগ্রাম করি। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ করে দেওয়ার পর আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক ‘অদম্য বাংলা’র চোখে-মুখে কালো পতাকা দিয়ে আটকে দিই। এটা প্রতিকী হিসেবে আমরা প্রতিবাদ জানাই। পরবর্তীতে আমাদের সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট এসে আমাদের গেট থেকে না বেরোনোর নির্দেশ দেয়। বলে যে, বের হলে গুলি করার নির্দেশ দেবে। প্রায়ই আসলে এ ধরণের ভয় ও শংকার মধ্যে দিয়ে আন্দোলন চলমান থাকে। পরবর্তীতে ৩০ জুলাই আমরা শিববাড়িতে আন্দোলন করলাম। তখন পুলিশ এবং এনএসআই’র দপ্তর থেকে ফোন আসে এবং ওইদিন সার্কিট হাউজে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে আমাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ নির্যাতনের হুমকি দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে। পরে ৩১ তারিখে আমরা সাত রাস্তার মোড়ে প্রোগ্রাম ফেলি এবং সাত রাস্তার মোড় থেকে আমাদের ৬২ জনের অধিক গ্রেফতার হয়। সেখানে আমাদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারসেল এবং বুলেট ছুড়ে পুলিশ হামলা চালিয়ে ৫০-৭০ জনের মতো আহত হয়। পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃতদের ছাড়াতে গিয়ে থানায় আমাদের রাত কেটে যায়। পরবর্তীতে ২ তারিখে আমরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রোগ্রাম ফেলি। সেখানে পুলিশ গুলি চালায়। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী সেখানে আহত হয়। পরবর্তীতে আসলে ৪ আগষ্ট খুলনা স্বাধীন হয়।
আন্দোলনে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা কেমন ছিল? খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেক বেশি ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি রেজাউল করিম স্যার, বর্তমান ডিএসএ নাজমুস সাদাত শুভ স্যার, হাসান মাহমুদ সাকি স্যার, আবুল বাসার নাহিদসহ এ রকম আরও অনেক স্যারদের সাপোর্ট আমরা পেয়েছি। ৩০ তারিখ যখন আমাদের গ্রেফতার করা হয়, তখন শিক্ষকরা থানায় এসেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের আন্দোলনে শিক্ষকরা আমাদের সঙ্গে সামিল হয়েছেন। মানসিকভাবে আমাদের সাপোর্ট দিয়েছেন, কখনো কখনো আশ্রয়ও দিয়েছেন। তবে, এর সংখ্যা ২০ থেকে ৫০ জনের মধ্যে ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের ভুমিকা কেমন ছিল? তাদের ভূমিকা আসলে ন্যাক্কারজনক ছিল। তারা আন্দোলনের বিপক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলো। এমনকি মুগ্ধ ভাই মারা যাওয়ার পর ক্যাম্পাসে আমরা ঠিকমতো জানাযাও পড়তে পারিনি। গায়েবি জানাযা পড়ার ক্ষেত্রে তারা সেন্টাল মসজিদের ইমাম সাহেবকে ভয় দেখায়। এ কারণে জানাযাও সেভাবে পড়তে পারিনি। তারা হল ছাড়তে বাধ্য করেছে, নানা ভাবে ভয়ভীতিও দেখিয়েছে।
আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত সাংবাদিকদের ভূমিকা কেমন ছিল? সাংবাদিকদের ভূমিকা ইতিবাচক ছিল। সাংবাদিকরা তো আসলে বড় রোল প্লে করেছে। যদিও ২৪’এর পরে সামনের দিনগুলোতে আমরা ইয়োলো জার্নালিজম যেটা ফেস করেছি- সেটা আর ফেস করবো না। তবুও বলতে পারি, সর্বপরি অনেক মিডিয়া উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। সে কারনে আমরা সফল গণঅভ্যুত্থান করতে পেরেছি। বিশেষ করে ক্যাম্পাস প্রতিনিধিরা চেষ্টা করেছে, বিরোধিতা করেনি।
আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা কেমন ছিল? তাদের ভূমিকা ন্যাক্কারজনক ছিল, এর তীব্র প্রতিবাদ আমি এখনও জানাই। যে প্রশাসন তার ছাত্র হত্যার জানাযা পর্যন্ত পড়তে দেয় না এবং উল্লেখ করতে পারে না যে, কিভাবে মারা গেছে। প্রশাসন শিক্ষার্থীদের গুলির ভয় দেখিয়ে হল থেকে বের করে দেয়, এই প্রশাসন আসলে কখনই ভালো হতে পারে না। আমরা দেখেছি যে, আমাদের প্রশাসনের শিক্ষকরা সরকারের গোলামি বা পা-চাটা যেটাই আমরা বলিনা কেন- সেভাবেই শিক্ষার্থীদের শোষণ করেছে।
খুলনায় আন্দোলনের মূল পয়েন্ট শিববাড়ি-জিরো পয়েন্ট-সাচিবুনিয়া ও নতুনরাস্তায় অবরোধ সফল হতো কিভাবে? আমরা প্রতিদিন বসে প্লান করতাম যে, কিভাবে কর্মসূচী সফল করবো। যেহেতু আমরা শহরের মূল পয়েন্টগুলো আটকানোর চেষ্টা করতাম। যাতে করে মিডিয়া এবং প্রশাসনের নজর কাড়া যায় এবং সারা বাংলাদেশ যাতে খুলনাকে যানতে পারে যে এখানেও একটা আন্দোলন চলছে। এছাড়া আন্দোলনের খরচ বলতে গেলে আমার এখনও মনে পড়ে যে, আমি একদিন হঠাৎ করে অটোতে আসতেছিলাম। আমার মাথায় পতাকা বাধা দেখে এক লোক বললো যে, আপনি আন্দোলনে যাচ্ছেন? আমি বললাম হ্যাঁ। তখন বললো যে, আমি দুই হাজার বোতল পানি দেবো। এছাড়া আমাদের শিক্ষকরা আর্থিক সহযোগিতা করতেন যতটুকু পেরেছেন। বিভিন্ন মানুষ আমাদের সহায়তা করেছে। এছাড়া মাইক-ব্যানারের জন্য আমরা কিছু টাকাও তুলেছিলাম। আন্দোলনের পয়েন্টগুলোতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হয়ে লুকিয়েও যেতে হয়েছে। এছাড়াও যাওয়া-আসার পথে অনেক সময় অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এছাড়া হামলার ভয়ও ছিলো। সবকিছুকে ওভার কাম করেই আমাদের অবরোধ কর্মসূচি সফল করা হতো।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অংগ সংগঠনসূমহের সাথে সরাসরি কোন সংঘর্ষ হয়েছি কি-না ? না, সেভাবে সরাসরি কোন সংঘর্ষ হয়নি। তবে ৩১ জুলাই সাতরাস্তার মোড়ে আমাদের কর্মসূচি চলাকালে ময়লাপোতার মোড় থেকে যুবলীগের একটি মিছিল হামলার জন্য আসছিল। কিন্তু তার আগেই পুলিশ আমাদের ওপরে হামলা চালায়। এতে আমরা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং গ্রেফতার হই। এ কারনে যুবলীগ আমাদের ওপর হামলা করতে পারিনি।
আন্দোলন চলাকালীন সময় আপনি কি ধরণের হুমকির সম্মুখীন হয়েছিলেন? ব্যক্তিগত ভাবে প্রথমত আসলে ফিউচারে চাকরি পাবো না, সেকেন্ডলি যদি সরকার পতন না হয় তাহলে হয়তো গুম হয়ে যাবো, থার্ডলি আমার পরিবারের ইনফরমেশন তাদের কাছে ছিল- সেজন্য পারিবারিক চাপ এবং সর্বশেষ একটা পর্যায়ে জীবনের হুমকি ছিল। এছাড়া পড়াশোনা করতে পারবো না, আজীবন জেলে পস্তাতে হবে- এ ধরণের হুমকিও পেতাম। হুমকিগুলো প্রশাসনিক দপ্তর থেকেও আসছে। এছাড়া ডিজিএফআই, এনএসআই, পুলিশ এবং আননোন নাম্বার থেকেও আসছে। তবে সরাসরি কেউ হুমকি দেয়নি, ফোন করেই দিয়েছে।
আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের জন্য আপনারা কি কি পদক্ষেপ নিয়েছেন? এটাতো আসলে আমাদের পদক্ষেপ নেওয়ার তেমন সুযোগ নেই। ঢাকা থেকে সেন্টাল-ই এটা করা হচ্ছে। আর খুলনাতে আলহামদুলিল্লাহ বলতে হয় যে, কেউ শহীদ হয়নি। সবাই আহত হয়েছে, সাফিন নামে একজন চোখও হারিয়েছে। ওর চিকিৎসার জন্য আমরা খুলনা থেকে আবেদন জানিয়েছি। এছাড়া ঢাকায় শহীদ হওয়া খুলনার সাকিব রায়হানের পরিবারের জন্য সরকারি কিছু অনুদান দেওয়া হয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য ভাবে সরকার তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেই আমি মনে করি। এখনও চিকিৎসার অভাবে অনেকেই মারা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমি অবশ্যই হতাশ।
বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন ও আকাংখার বাস্তবায়ন হয়েছে কি-না? না, এটা তেমন একটা হয়নি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়েছে। যেমন আমরা ড. মুহাম্মদ ইউনুস স্যারের মতো একজন প্রধান উপদেষ্টা পেয়েছি। কিছু কিছু ভালো লোকও আমরা উপদেষ্টা মন্ডলীতে পেয়েছি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সর্বপ্রথম আমার প্রাধান্য ছিলো শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তন। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে আমি নতুন কোন পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না। নতুন যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা- সে ধরনের চেঞ্জ দেখছি না। হয়তো বা রাজনীতিতে যে কলুসতার চাপ সেটা কিছুটা হলেও কম আছে। এছাড়া ব্যাংক খাতগুলোকে একটি যায়গায় আনা হয়েছে, রিজার্ভ বেড়েছে, দুর্নীতি কমেছে, বিদেশে হয়তো বা অর্থ পাচার হচ্ছে-না, আমাদের বেশকিছু ঋণ ছিলো বিদেশিদের কাছে- সেগুলো পরিশোধ করা হয়েছে, অতিরিক্ত ইন্ডিয়া প্রেম বা ইন্ডিয়ার সঙ্গে যে চুক্তি ছিলো সেগুলো নতুন করে আর করা হয়নি, বিশ্ব বাজারে চীন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে। বিশ্ব হয়তো নতুন ভাবে বাংলাদেশকে দেখছে। তবে আমাদের দেশে ৫৪ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও একটিও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় নেই। সুতরাং সেইভাবে কোন গবেষণা হয়না। শিক্ষকরাও লেজুড়বিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেখানে শিক্ষা ও গবেষণায় কোন বরাদ্দ নেই। কিন্তু অনেক বেশি বেশি বাজেট করা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানুষের কল্যাণে কোন কাজ করতে পারে না। এ রকম অনেক আকাংখা আছে- যা বলে শেষ করা যাবে না।
স্বৈরাচার পতন-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে আপনার প্রত্যাশা কি? প্রত্যাশা একটাই যে, বাংলাদেশে আর যেণ কেউ স্বৈরাচার হয়ে উঠতে না পারে- এ ধরণের একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। পলিটিক্সে আমি চাই যে, শিক্ষিতরা যাতে এগিয়ে আসে। আমি মমতাজের মতো আর কোন এমপি দেখতে চাইনা, আমি আর দেখতে চাইনা যে, হাজী সেলিমের মত বড় সিন্ডিকেট, বড় বড় সন্ত্রাসী, আমি নারায়ণগঞ্জের শামীম উসমানের মতো এ রকম বড় বড় গডফাদার দেখতে চাইনা। আমি দেখতে চাই, ইতিবাচক রাজনীতি। যে রাজনীতি আসলে দেশও জাতির কল্যাণে এগিয়ে যাবে এবং আমি দেখতে চাই এ দেশে প্রকৃত শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণায় উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এগিয়ে যাবে। এছাড়া শিক্ষা ও কৃষি সেক্টরের উন্নয়ন এবং মানব সম্পদকে কাজে লাগানো হবে- এভাবেই বিশ্বকে আমি আমার নতুন বাংলাদেশ দেখাতে চাই।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button