মেয়ের অপকর্মে বাবার দায়!

শেখ মুজিবকে জাতির পিতা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ায় ক্ষোভ
খুলনার বিভিন্ন স্পটে মুর্তি ভাংচুর
মোঃ রায়হান মোল্লা ঃ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে হাসিনা সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের শুরুর দিন খুলনার শিববাড়িসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নেয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষোভে নগরীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর মুর্তি ভাংচুর করে আন্দোলনকারীরা। এ বাংলার মাটিতে ফ্যাসিবাদের কোনো চিহ্ন যেন না থাকে সেই জেরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে মুছে দেওয়া হয় শেখ মুজিবের নাম। স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতো। বিভিন্ন অফিস আদালতে বাধ্যতামূলকভাবে টাঙিয়ে রাখা হতো বঙ্গবন্ধুর ছবিও। দেশের জনগন মন থেকে মেনে না নিলেও বাধ্য করা হতো। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটুক্তি ও অবমাননা করায় কত জনে জেল খেটেছে। নিরিহ মানুষের উপর চালিয়েছে নির্যাতন। সেই নির্যাতন ও জুলুমের অবসান ঘটিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর আগে দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০ হাজারের বেশি ম্যুরাল, ভাস্কর্য ও প্রতিকৃতি স্থাপন করে আওয়ামী লীগ সরকার। টানা ১৫ বছর ধরেই ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও প্রতিকৃতি তৈরির মহোৎসবে মেতে উঠেছিল দলটি। এই কর্মে উদ্যোগী ভূমিকা ছিল স্থানীয় প্রশাসনের। অনেক সংস্থা নিজ উদ্যোগেও এগুলো তৈরি ও স্থাপন করে। এর জন্য রাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই বিপুল ব্যয় এখন অপ্রয়োজনীয় ও অপচয় হিসেবেই মূল্যায়িত হচ্ছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় : সেদিন মধ্যরাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সমবেত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ‘কালজয়ী মুজিব’ বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুর করে। তখন শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে থাকে, ‘ফ্যাসিবাদের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘ফ্যাসিবাদের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না। তবে রাতে ম্যুরালটি পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব না হলেও পরে পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে বেদিসহ ৩৮ ফুট উঁচু ও ৪৩ ফুট বিস্তৃত শেখ মুজিবের ম্যুরাল ‘কালজয়ী মুজিব’ স্থাপন করা হয়েছিলো। এ ম্যুরাল নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান।
খুলনায় বিএল কলেজ : সরকারি ব্রজলাল কলেজে (বিএল) খেলার মাঠের পাশে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। ওই সময় তারা বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভাঙচুরের সময় শিক্ষার্থীরা ‘আমার সোনার বাংলায় মুজিববাদের ঠাঁই নাই, জ্বালোরে-জ্বালো আগুন জ্বালো, আওয়ামী লীগের আস্তানা ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও, মুজিববাদের আস্তানা ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাওসহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
খুলনা প্রেসক্লাব ঃ গত ৪ই আগষ্ট দুপুরে আন্দলনকারীরা খুলনা প্রেসক্লাবে ভাংচুর চালায়। এসময় সেখানে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর মুর্তি ভেঙ্গে ফেলে। পরে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে আরেক দফা ভাংচুর করে প্রেস ক্লাবের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয়।
জেলা পরিষদ ঃ ৪ই আগস্ট দুপুরে খুলনা জেলা পরিষদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে অন্দোলনকারীরা। জেলা পরিষদে অবস্থিত শেখ মুজিবের ম্যুরাল ভাংচুর করা হয়। গ্যারেজে রাখা পরিষদের কর্মকর্তাদেরসহ পাঁচটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
নগরভবন : বিভিন্ন জায়গায় হামলা ভাংচুরের এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার একটি অংশ নগর ভবনে ঢুকে সেখানে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাংচুর করে। স্লোগান দিতে দিতে ভাংচুর করা হয় এ ম্যুরাল।
বিএমএ অফিস : নগরীর সাতরাস্তার মোড়ে আন্দলনরত শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও অগ্নি সংযোগ করে। এসময় বিএমএ অফিসের গেটের বাইরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর অংকিত ছবি খোদাই করে উঠে ফেলানো হয়।
খুলনা রেডিও বেতার : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ৪ ও ৫ আগস্ট দফায় দফায় খুলনা বেতারে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসময় খুলনা বেতারে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর মুর্তি ভেঙে ফেলা হয়। ভবনের একাধিক কক্ষ, সম্প্রচারের মূল্যবান যন্ত্রপাতি লুটপাট ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অগ্নিসংযোগের কারণে বেতারকেন্দ্রের অবকাঠামো, সম্প্রচারের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রপাতিসহ সব কক্ষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অবকাঠামো ও অন্যান্য জিনিস মিলে শতকোটি টাকার ওপরে ক্ষতির শিকার হয় সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি। শুধু তাই নয় আগুনে পুড়ে যায় গত ৫৪ বছরের নথিপত্রসহ সংরক্ষিত অমূল্য সম্পদ। বন্ধ হয়ে যায় সম্প্রচার।



