আমার দেখা খুলনার জুলাই বিপ্লব

শারমিন নাহার মিতু ঃ কোটা আন্দোলন থেকে জন্ম ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লব । ইতিহাসে দেখেছি ৭১ এর গণহত্যা, দেখেছি ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ২০২৪ এ দেখলাম জুলাই বিপ্লব। শুধু দেখেনি ফ্যাসিস্টদের ক্ষমা প্রার্থনা। খুলনার রাজপথে জুলাই যোদ্ধাদের উৎকণ্ঠিত মায়েদের সাথে করেছি সরবে অশ্রু বিসর্জন। শরিক হয়েছি মিছিলে। হাতে নিয়েছি খুলনা শিববাড়ির মোমবাতির আলোক শিখা। এ ছিলো আমার দেখা আরেক গণঅভ্যুত্থান। সামনে পেয়েছি জুলাই যোদ্ধা সাজেদুল বাপ্পি, মহররম মাহিন আর রুমি রহমানের মত বিপ্লবীকে। যারা পাঞ্জেরীর মত পথ দেখিয়েছিল সেদিন। সমগ্র বাংলাদেশের মত প্রাণের নগরি খুলনাও পিছিয়ে ছিল না কখনো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরদিন ১৯ জুলাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজনতা পড়ে গায়েবানা জানাযা। যে শিক্ষার্থীরা আহত হতো, তাদের স্থানে তাদের বাবা-মা-ভাইবোনসহ খুলনার আপামর মুক্তিকামী মানুষ সকলেই অকাতরে শরিক হয়েছেন। যেখানে রাতের অন্ধকারকে উপেক্ষা করে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী সেদিন পায়ে হেটে পৌছেঁছে ঢাকার শাহাবাগ, ঢাবিসহ রাজপথের রণপ্রাঙ্গনে। পরদিনই চাচাতো বোন লিন্ডা ফাতেমার লাইভ দেখে হাজির হয়েছিলাম শিববাড়ির মোড়। শুধু শিববাড়িই নয়, খুলনার সকল জিরোপয়েন্ট, দৌলতপুর, নতুনরাস্তা মোড়, রয়েল চত্বর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়- সর্বত্রই ছিলো আন্দলনের উত্তাল। শেষ দিকে সকলেই চেয়েছে একদফা একদাবি। শেখ হাসিনা কবে যাবি।
যে আন্দোলনে চলেছে গুলি, লাঠিচার্জ, আগুন, টিয়ারসেলসহ নানা রকম অত্যাচার। সেগুলো উপেক্ষা করেই এগিয়ে গেছে খুলনার ছাত্র-জনতা। এ আন্দলনে শুধু সাধারন খুলনাবাসিই নয়, অংশ নিয়েছিলেন-জ্ঞানি-গুণী ব্যক্তিসহ অফিস আদালতের চাকুরিজীবিগণও। এক কথায় খুলনাবাসির অংশগ্রহণ ছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের মত। উত্তাল ছিল জুলাই আন্দোলন। যার জন্যই সফলতা পেয়েছে রক্তে রঞ্জিত জুলাই। এ যেন বাংলার আরেক বিজয়। বরাবরই খুলনার বিজয় পিছিয়ে থাকে, দেশের মূল বিজয় থেকে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে খুলনা ছিল শুরু থেকেই সক্রিয়। তারই ফলশ্রুতিতে খুলনা স্বাধীন হয় একদিন আগে ৪ আগস্ট। নতুন বাংলাদেশ ফিরে পেলেও খুলনার ছাত্র-জনতা অপেক্ষায় ছিল। তারা কেন্দ্রের বিজয় ঘোষণার পর ৫ আগস্ট সন্ধ্যার আগ মূহুর্তে আনন্দ মিছিল বের করে। বাধ ভাঙ্গা বিজয় মিছিলে শরীক হয় লাখো জনতা। খুনি শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছে। এমন খবর নিশ্চিত হওয়ার পর লক্ষাধীক মুক্তিকামী মানুষ খুলনার শিববাড়ীমোড়ে হাজির হন। শরীক হন বিজয় মিছিলে। ১০ জুলাই দৌলতপুরে রেললাইন অবরোধ, একে একে জুলাই বিপ্লবীদের উপর হামলা, দফায় দফায় মিছিল, অগ্নি সংযোগ, অসহযোগ সব কিছুই চলতে থাকে। খুলনা সার্কিট হাউজে চলেছিল ছাত্রদের উপর স্নায়ু চাপ। যাতে করে আন্দোলন তরান্বিত হতে না পারে। কিন্তু তাতেও বন্ধ হয়নি আন্দোলন। জুলাই বিপ্লবী, সাজেদুল বাপ্পির বক্তব্য মতে- আহতরা একটু সুস্থ হয়েই আবারও চলে এসেছে রাজপথে। রুমি রহমানের মা, তাকে ওযু করে পাঠিয়েছেন, আন্দোলনে অংশ নিতে। যদি সে শহীদ হয়ে যায়, তাহলেও তার কোন সমস্যা ছিল না।। মায়েরা নিজহাতে রণসজ্জ্বায় সাজিয়ে দিয়েছিল নিজ পুত্র-কন্যা-স্বামীসহ পুরো পরিবারকে। তাই মহররম মাহিনের ভাষায় বলি-হামলা মামলা করে ছাত্র-জনতাকে দমাতে পারেনি স্বৈরাচারি ফ্যাসিস্ট সরকার, খুলনার হাজারো সূর্য সন্তানের জুলাই বিপ্লব ছিল খুবই কঠিন। মৃত্যুর ভয়ে আমরা ভীত ছিলাম না। অকুতোভয় বীর সৈনিক আমার খুলনাবাসি। দীর্ঘমেয়াদী হোক আমাদের এই জুলাই বিপ্লব। জুলাই বিজয় সফলতা বয়ে আনুক দেশমাতৃকার জন্য। এটাই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।



