কেসিসির মৃত কর্মচারীর নামে সাড়ে ৩ বছর বেতন উত্তোলনের টাকা আতœসাতের ঘটনায় তদন্ত কমিটি

# আতœসাতকৃত ৬ লক্ষাধীক টাকা ফেরৎ দিলেও দায়মুক্তি মিলছে না #
স্টাফ রিপোর্টারঃ খুলনা সিটি করপোরেশনে (কেসিসি) মৃত কর্মচারীর নাম বেতনের তালিকায় রেখে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা উত্তোলন ও আত্মসাৎ করার অভিযোগে নতুন করে তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। গত ২১ আগস্ট এ কমিটি গঠন করা হয়। সাড়ে তিন বছরের অধিক সময় ধরে স্বাক্ষর জালিয়াতি করে বেতন ও বোনাসের টাকা তোলা হয়। আতœসাতকৃত সমুদয় টাকা কেসিসির ফান্ডে জমা দিলেও দায়মুক্তি মিলছে না তাদের। যার জন্য নতুন করে গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তদন্ত কমিটির অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, উপর্যুক্ত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য সহকারী বর্তমানে কঞ্জারভেন্সি শাখায় নি¤œমান সহকারী হিসেবে কর্মরত মোঃ আনোয়ার হোসেন, কেসিসি’র ১৮নং ওয়ার্ডের স্প্রে-ম্যান (নো-ওয়ার্ক-নো-পে) মোঃ ইব্রাহিম, পিতা-মোখলেচুর রহমান গত ২০২০ সালের ৭মে মৃত্যুবরণ করার বিষয়টি ১৮নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মোঃ হাফিজুর রহমান মনি ওই বছর ১ মে তার স্বাক্ষরিত অফিসিয়াল প্যাডের মাধ্যমে সাধারণ প্রশাসনিক শাখাকে অবহিত করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি প্রশাসনিক শাখা হতে একটি মন্তব্য পত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়ে সাবেক প্রধানবর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা (অব) মোঃ আব্দুল আজিজ বরাবর অগ্রগামি করা হয়। তিনি উক্ত মন্তব্য পত্রটি সংরক্ষণের জন্য মোঃ আনোয়ার হোসেনকে নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু তা সত্বেও দীর্ঘদিন যাবত মৃত: মোঃ ইব্রাহিম এর নামে বেতন সীট প্রস্তুত ও বেতন ভাতাদি প্রদানের জন্য বেতন সীটে স্বাক্ষর হয়েছে এবং সীটের টাকা কারো দ্বারা নিয়মিত উত্তোলন হয়েছে। যা আনোয়ার হোসেনের দেখার দায়িত্ব ছিল, কিন্তু তিনি বিষয়টি দেখভাল করেননি। তাছাড়া মৃত: ব্যক্তির হাজিরা কোন দপ্তর হতে উপস্থাপন করা হয়েছে সে বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে পরীক্ষা নিরীক্ষা না করে মৃত; ব্যক্তির বেতন সীটে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে বেতন ভাতাদি প্রদান করা হয়েছে। ফলে কেসিসি আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে কেসিসি’র গত ২৫ মাচ’২৪ তারিখের ৪৩২ নং স্মারকে আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ০১-২০২৪ নং বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে মোঃ আনোয়ার হোসেন গত ৮এপ্রিল’২৪ তারিখে ০১-২০২৪ নং বিভাগীয় মামলার জবাব দাখিল করেছেন। এমতাবস্থায়, আনোয়ার হোসেন কর্তৃক দাখিলকৃত ০১-২০২৪ নং বিভাগীয় মামলার জবাবটি পুংখানু পংখরূপে তদন্ত করার জন্য নির্দেশক্রমে গত ২১ আগস্ট তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহবায়ক কেসিসির ভেটেরিনারি অফিসার ড. পেরু গোপাল বিশ্বাস, সদস্য এষ্টেট অফিসার গাজী সালাউদ্দীন ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান সহকারি শাহীনুর জামান। পত্র প্রাপ্তির ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়। কেসিসির সচিব শরীফ আসিফ রহমান এ কমিটি গঠন করেন। কেসিসি সূত্রে জানা গেছে, খুলনা সিটি করপোরেশনের মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে চাকরি করতেন শেখ ইব্রাহিম। তার বাড়ি মহানগরীর গোবরচাকা মেইন রোড (খালাসি মাদ্রাসার সামনে)। করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে কনজারভেন্সি শাখার স্প্রে-ম্যান হিসেবে চাকরিরত অবস্থায় ২০২০ সালের ৭ মে তিনি মারা যান। দায়িত্বে থাকাকালে শেখ ইব্রাহিম ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়েছেন। ইব্রাহিমের স্ত্রী তাসলিমা বেগম জানান, তাদের ৩ সন্তান রয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি করপোরেশনে যোগাযোগ করেন। কিন্তু করপোরেশন থেকে তখন তাকে মাত্র সাত দিনের বেতন দেওয়া হয়। এরপর তিনি করপোরেশন থেকে আর কোনও টাকা পাননি। সূত্রে আরো জানা গেছে, ২০২০ সালের ৭ মে ইব্রাহিম মারা গেলেও মাস্টাররোল শ্রমিকের তালিকায় তার নাম থাকে। ফলে ২০২০ সালের ৭ মে থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত বেতন, বোনাসসহ সমুদয় টাকা উত্তোলন করা হয়। সাড়ে তিন বছরের অধিক সময়ে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। কেসিসি সূত্রে প্রকাশ, মারা যাওয়ার আগে ইব্রাহিম ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে মাস্টাররোলে মশকনিধন কাজে স্প্রে-ম্যান ছিলেন। ইব্রাহিম মারা যাওয়ার পর থেকে তার নামে বেতন ও বোনাসের টাকা উত্তোলন করা হয়। মাস্টাররোল ও আউটসোর্সিং শ্রমিকদের বেতন শিট প্রস্তুত এবং বেতন প্রদানে আগে দায়িত্বে ছিলেন কনজারভেন্সি শাখায় কর্মরত সাইফুল ইসলাম (মাস্টাররোল শ্রমিক)। পরে দায়িত্ব পালন করেন গ্যারেজ শাখার মেকানিক সহকারী হিসেবে কর্মরত শেখ শহিদুল ইসলাম।’ এরপর তিন মাস ধরে জাহাঙ্গীর নামের এক কর্মচারীকে বেতন শিট প্রস্তুত ও বেতন বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন দেখা যায় আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর এই তিন মাস ইব্রাহিম বেতন নিতে আসেন না। বিষয়টি নজরে আসে। যা কর্তৃপক্ষকের অবহিত করা হয়।’ এ ঘটনায় ওই সময় সংশ্লিষ্ট চার জনকে শোকজ করা হয়। এরা হলেন কেসিসির সাবেক প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা (অব)আ. আজিজ, কনজারভেন্সি বিভাগের বড় বাবু আনোয়ার হোসেন, শিক্ষা শাখার সাবেক মাস্টাররোল শ্রমিক সাইফুল রহমান (চাকুরিচ্যুৎ), গ্যারেজ শাখার শহিদুল ইসলাম (চাকুরিচ্যুৎ)। এদিকে ওই সময় অভিযোগ ওঠে, ‘শোকজ নোটিশ পেয়ে ৪ জন আত্মসাৎকৃত টাকা কেসিসির ফান্ডে ফেরত দেন। এর মধ্যে সাবেক প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আ. আজিজ দেন দু’ লাখ টাকা, কনজারভেন্সি শাখার বড় বাবু আনোয়ার হোসেন দু’ লাখ টাকা, চাকুরিচ্যুৎ মাস্টাররোল শ্রমিক সাইফুর রহমান এক লাখ টাকা, গ্যারেজ শাখায় কর্মরত চাকুরিচ্যুৎ শহিদুল ইসলাম এক লাখ টাকা ও বিল প্রস্তুতকারী রুবেল ৮ হাজার টাকা। এই ছয় লাখ ৮ হাজার টাকা তারা সাবই মিলে কেসিসির ফান্ডে জমা দেন। তারপর তারা মেয়রের নিকট ক্ষমা চান।’ তবে রুবেল ও সাইফুল টাকা জমা দেয়ার কথা অস্বীকার করেন। কিন্তু গত ২০২৩ সালে ১১ ডিসেম্বর কনজারভেন্সী বিভাগের সহকারি আনোয়ার হোসেন নিজ নামে আতœসাতকৃত ৬ লাখ ৭ হাজার ৮৮০ টাকা কেসিসির ফান্ডে জমা দেন। যার বই নং-৫৫ ও রশিদ নং-৫৫২৩। সমুদয় টাকা জমা দেয়ার সত্যতা স্বীকার করেন আনোয়ার হোসেন। ওই সময় রুবেলকে চাকুরিচ্যুত করা হলেও পরে তাকে আবারো চাকুরি পূর্ন বহাল করে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে রুবেল ট্রেড লাইসেন্স শাখায় ইন্সপেক্টর পদে দায়িত্ব পালন করছেন। কমিটির প্রধান কেসিসির ভেটেরিনারি অফিসার ড. পেরু গোপাল বিশ্বাস বলেন, তারা বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই তদন্ত কার্যক্রম শুরু করবেন। উল্লেখ্য, কেসিসির মৃত কর্মচারীর নামে বেতন উত্তোলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওই সময় চাকরি হারান মাস্টাররোলের ৩ কর্মচারী। ২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর কর্তৃপক্ষ তাদের চাকরিচ্যুতির অফিস আদেশ জারি করেন। চাকরি হারানো কর্মীরা হলেন: লাইব্রেরিতে কর্মরত অফিস সহায়ক সাইফুল ইসলাম, কনজারভেন্সি বিভাগের রুবেল হোসেন ও যানবাহন শাখার শহিদুল ইসলাম।



