স্থানীয় সংবাদ

‘খুলনাঞ্চলে’ শঙ্কা কাটিয়ে আমন চাষে ঝুঁকছেন চাষীরা

# অর্থ বছর ২০২৫-২০২৬’র খরিপ- ২ মৌসুমে রোপা আমন আবাদ #
# অতিবৃষ্টিতে অঞ্চলে রোপা আমনের ক্ষতির পরিমান প্রায় ৪ কোটি টাকা #
# চলতি বছরের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ২,৯৮,৬৩৫ হেক্টর, সর্বশেষ অগ্রগতি ২,৪৪,৮১২ হেক্টর, হার ৮২% #
# সংশ্লিস্টরা বলছেন : ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে চাষীদের সর্বাত্বক সহয়তা করা হচ্ছে #

মো. আশিকুর রহমান : চলতি অর্থ বছর ২০২৫-২০২৬’র খরিপ-২ মৌসুমে রোপা আমন আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রানুসারে খুলনা অঞ্চল (খুলনা, বাগেরহাট,সাতক্ষীরা ও নড়াইল জেলাসমূহের) চাষীরা আমন চাষে ঝুঁকেন। কিন্তু চলতি বছরের জুলাই মাসে দক্ষিনাঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে এই অঞ্চলের কৃষকের রোপা আমন আবাদ ও বীজতলা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ও শঙ্কার মধ্যে দিন কাটিয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে চলতি মৌসুমে রোপা আমন চাষীদের স্বপ্ন পানিতে নিমজ্জিত হয়। সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টির কারণে খুলনাঞ্চলে রোপা আমন আবাদ ও বীজতলা ক্ষতিগ্রস্থ হয় ৩৮০.৩ হেক্টর জমি। যার মধ্যে ৫ হেক্টর আবাদ ও বীজতলা ৩৫৭.৩ হেক্টর। ক্ষতির পরিমান ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৪২ টাকা। যার মধ্যে আবাদের ক্ষতির পরিমান ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা ও বীজতলার ক্ষতির পরিমান ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৪২ টাকা এবং ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের সংখ্যা ২৪, ১৪০ জন। অবশেষে শঙ্কা কাটিয়ে এই অঞ্চলের কৃষকেরা পুনরায় চাষে ঝুঁকছেন চাষীরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার অঞ্চলের সংশ্লিষ্টরাও তাদের রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্য কৃষকদের পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে প্রনোদনা (পুর্নবাসন সহয়তা) স্বরুপ ধানের বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করছেন। আশা করা যাচ্ছে, রোপা আমন চাষে সকল শঙ্কা কাটিয়ে এই অঞ্চলের সংশ্লিষ্টরা এবং চাষীরা সম্বলিতভাবে চলতি অর্থ বছর ২০২৫-২০২৬’র খরিপ-২ মৌসুমে রোপা আমন আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে। শঙ্কা কাটিয়ে এই অঞ্চলের চাষীরা এখন তাদের জমিতে রোপা আমন রোপনের পর আগাছা দমন ও পরিচর্যা, পোকা মাড়ক দমনসহ বিবিধ কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চল সূত্রে জান গেছে, এই অঞ্চলের ৪ টি জেলার সর্বমোট আবাদযোগ্য জমির পরিমান ৫ লক্ষ ৩৪ হাজার ৮০৩ হেক্টর। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে খুলনাঞ্চলের ৪ জেলার রোপা আমন (হাইব্রীড,উফশী ও স্থানীয় জাতের) আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ২ লক্ষ ৯৮ হাজার ৬৩৫ হেক্টর, যার মধ্যে খুলনা জেলা ৯৩২৭০ হেক্টর, বাগেরহাট ৭৩,২৪৫ হেক্টর, সাতক্ষীরা ৮৮,৬৭০ হেক্টর ও নড়াইল জেলা ৪৩,৪৫০ হেক্টর। বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) সংশ্লিস্ট দপ্তরের সর্বশেষ তথ্যনুসারে রোপা আমন আবাদের অগ্রগতি ২,৪৪,৮১২ হেক্টর, যার হার ৮২%। যার মধ্যে জেলার অগ্রগতি খুলনা ৬৯,৬০৪ হেক্টর, হার ৭৪.৬%, বাগেরহাট ৪৫,৭০৭ হেক্টর, হার ৬২.৪%, সাতক্ষীরা ৮৬,০৪৬ হেক্টর, হার ৯৭% এবং নড়াইল ৪৩,৪৫৫ হেক্টর, হার ১০০%। চলতি বছরের জুলাই মাসে দক্ষিনাঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে এই অঞ্চলের কৃষকের রোপা আমন আবাদ ও বীজতলা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ও শঙ্কার মধ্যে দিন কাটিয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে চলতি মৌসুমে রোপা আমন চাষীদের স্বপ্ন পানিতে নিমজ্জিত হয়। সংশ্লিস্টরা বলছেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে খরিপ-২ মৌসুমে রোপা আমন আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শঙ্কা দেখা দেয়। অতিবৃষ্টির দরুন রোপা আমনের বীজতলা ও আবাদ চরম ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কয়েক হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ওই শঙ্কা কাটাতে চলতি অর্থ বছরে রোপা আমনর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্য পুনরায় কৃষকদের ঘুরে দাঁড়াতে প্রণোদন প্রদান করা হয়। আশা করা যাচ্ছে এই অঞ্চল সংশ্লিস্টরা এবং চাষীরা সম্বলিত প্রচেষ্টার মাধ্যেমে মৌসুমে রোপা আমন আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে।
এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক মো. সেলিম মোড়ল জানান, বৃষ্টিতে আমার রোপা আমনের বীজতলা ডুবে যায়। আমি ওই সময় ৪০ কেজি ধানের বীজ ফেলে ছিলাম। ওই বীজে প্রায় ১০ কাঠা জমিতে আমন ধান বপণ করা যেত। অবশেষে পুনরায় উপজেলা অফিস হতে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করেছে। এছাড়া সব বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছে। এখন জমিতে আগাছা দমন, পোকামাকড় দমনে কাজ করছি।
এ বিষয়ে খুলনাঞ্চলের অর্ন্তভূক্ত নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম জানান, অতিবৃষ্টির কারণে গত জুলাই মাসে আমার ব্লকের বীজতলা ১৪ হেক্টর ও আবাদ ২৫০ হেক্টর আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের প্রণোদনা হিসাবে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা ২৬৫ হেক্টর। ইতোমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে ২৫০ হেক্টর, ৯৩%। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের উপজেলা অফিস হতে প্রণোদনা হিসাবে বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে। আশা করি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবো।
এ বিষয়ে খুলনা জেলার দিঘলিয়া উপজেলার কৃষি অফিসার মো. কিশোর আহম্মেদ জানান, অতিবৃষ্টি জনিত কারণে আমার উপজেলায় খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি, ৩ হেক্টর জমিতে পানি জমে গেলে ঝুকি বাড়লেও পরবর্তীতে ঠিক হয়ে যায়। চলতি বছরে আমার উপজেলায় রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা ১৯,০৭৫ হেক্টর জমি। ইতেমধ্যে ১৮,০৫০ হেক্টর জমিতে রোপনের অগ্রগতি সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলার পক্ষ থেকে কৃষকদের সর্বাত্বক সহায়তা করা হচ্ছে, আশাবাদী আমাদের ও চাষীদের সম্বলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই উপজেলা রোপা আমন আবাদ ও উৎপাদন অর্জনে সফল হবে।
এ ব্যাপারে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. একরামুল হোসেন বলেন, অতিবৃষ্টি জনিত কারণে পাইকগাছা উপজেলায় ৬৫ হেক্টর জমির বীজতলা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ক্ষতির পরিমান ৩২,২২,৭৩৬ টাকা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককের সংখ্যা ১৫৭০ জন। কৃষকদের ঘুরে দাঁড়াতে প্রণোদনা (পুর্নবাসন) হিসাবে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদানসহ সার্বিক বিষয়ে সহায়তা করা হচ্ছে। চলতি অর্থ বছরে এই উপজেলায় রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা ১৫ হাজার ৫’শ হেক্টর। ইতোমধ্যে ৬,৭৭০ হেক্টর জমিতে রোপন সম্পন্ন হয়েছে, যার অগ্রগতির হার ৪৬%। আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে বাকি রোপনের শতভাগ সম্পন্ন হবে। আশা করি আমাদের ও চাষীদের সম্বলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই উপজেলা রোপা আমন আবাদ ও উৎপাদন অর্জনে সফল হবে। এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক (এডি) কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি অর্থ বছর ২০২৫-২০২৬’র খরিপ-২ মৌসুমে রোপা আমন আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা কাজ শুরু করি। কিন্তু এ বছরের জুলাই মাসে অতিবৃষ্টির দরুন সংশ্লিষ্ট জেলা সমূহের রোপা আমনের বীজতলা ও কিছু আবাদ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ক্ষতির পরিমান গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি টাকার মতো। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন হাজারো কৃষক। ওই ক্রান্তিকালে এই অঞ্চলে চলতি মৌসুমে রোপা আমন আবাদের শঙ্কা কাটিয়ে উঠতে প্রণোদনা (পুর্নবাসন) স্বরুপ বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে সার্বিক বিষয়ে সহায়তা করা হচ্ছে। আশা করি, রোপা আমন চাষে সকল শঙ্কা কাটিয়ে এই অঞ্চলের সংশ্লিষ্টরা এবং চাষীরা সম্বলিত প্রচেষ্টার মধ্যেমে খরিপ-২ মৌসুমে রোপা আমন আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই অঞ্চল সক্ষম হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button