স্থানীয় সংবাদ

মোংলা বন্দরের ইজারা দেয়া পুকুরগুলোতে মাছ চাষে সুপেয় পানি সংকট : পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে স্থানীয়রা

# পরিবেশবাদী সংগঠনসহ স্থানীয়দের ইজারাদার প্রথা বাতিলের দাবি #

মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি ঃ মোংলা পৌর শহরে বন্দর কর্তৃপক্ষের ইজারা দেয়া পুকুরগুলোতে অধিক মুনাফা লাভের আশায় ইজারাদারের বিপুল পরিমাণ মাছ চাষের কারণে সুপেয় পানি দূষিত হয়ে এলাকায় মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। স্থানীয়দের জন্য সুপেয় পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস এ পুকুরগুলোতে মাছ চাষের কারণে পানি ক্রমশ দূষিত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা পড়েছেন চরম ভোগান্তি আর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। পরিবেশবাদী সংগঠনসহ স্থানীয় ভূক্তভোগীরা সুপেয় পানির উৎস এসব পুকুরগুলো মাছ চাষের জন্য ইজারা প্রদাণ বন্ধের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পুরাতন বন্দর এলাকার (মুল পৌর শহর) সুপেয় পানির পুকুরগুলো এখন আর আগের মতো নিরাপদ নেই। ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ৮টি পুকুর বিশেষ করে বিএলএস, কবরস্থান, রাতারাতি কলোনী ও আল প্রিন্স এলাকার ৪টি বড় পুকুর এক সময় স্থানীয়দের জন্য বিশুদ্ধ পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। এখন মাছ চাষের কারণে ক্রমশ দূষিত হয়ে পড়ছে। প্রতি বছর বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্পত্তি শাখা থেকে এই ছোট বড় ৮টি পুকুর মাছ চাষের জন্য ইজারা দেয়া হয়। ইজারাদাররা অধিক মুনাফার আশায় পুকুরে ব্যাপকহারে মাছ চাষ করছেন। মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক ও ক্যামিক্যাল মিশ্রিত ফিড ও ফিস মিল। এসব খাবারের ক্ষতিকর উপাদান পানিতে মিশে পুকুরের স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করছে। গরমকালে পানি পঁচে দুগর্ন্ধ সৃষ্টি করছে। এতে এলাকায় বসবাস করা দায় হয়ে পড়ে। ফলে এক সময় সুপেয় হিসেবে ব্যবহৃত এই পুকুরগুলো এখন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিকল্প কোনো নিরাপদ পানির উৎস না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে এই দূষিত পানি গোসল, রান্না, কাপড় ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করছেন। ভুক্তভোগী বিএলএস রোড় সংলগ্ন পুকুর পাড়ের বাসিন্দা মাছ ব্যবসায়ী কাজী আলম (৪০) বলেন, দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে এলাকায় পেটের পীড়া, ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কবরস্থান সংলগ্ন পুকুর পাড়ের অপর বাসিন্দা শ্রমিক আঃ জব্বার (৫০) বলেন, গরমকালে পুকুরের পানি থেকে নানা দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে এলাকায় চরমভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটছে। গন্ধে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করা কষ্ট হয়ে যায়। রাতারাতি কলোনী সংলগ্ন পুকুর পাড়ের বাসিন্দা গৃহবধূ তাসলিমা বেগম ( ৫৫) বলেন, মাছ চাষের কারণে পুকুরের পানি ব্যবহার করা যায় না। এছাড়া এ মাছ চাষের ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে এলাকায় মারামারি ও সহিংস ঘটনা ঘটতেই থাকে। আল প্রিন্স সংলগ্ন পুকুর পাড়ের বাসিন্দা চাকরিজীবি মনির হোসেন ( ৪২) বলেন, এ পুকুরের পানি এক সময় অনেকটাই বিশুদ্ধ ছিল। এলাকার মানুষ পুকুরটির পানি পান পর্যন্ত করতেন। কিন্তু ক্রমাগত মাছ চাষের কারণে এর পানি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন এ পানি ব্যবহার করলেই নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। সব পুকুরগুলোর পাড়ের ভূক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, এ বিষয়ে বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না তাদের। মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ শাহীন বলেন, পুকুরের দূষিত পানি ব্যবহার করার ফলে মানুষজন ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটে ব্যথাসহ নানা ধরণের পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া এ দূষিত পানির কারণে নানা চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায় যাতে করে পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিশুরাই অনেক বেশী স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকছে। এদিকে পুকুরগুলোর ইজারা ও মাছ চাষকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ইজারার নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দ্বন্দ্ব ও সংঘাত লেগেই থাকছে। এতে করে এলাকাবাসীর মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত সপ্তাহ খানেক ধরে ইজারা দেয়া পুকুরগুলোর মাছ ধরা ও দখল নিয়ে স্থানীয় বিবদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে দ্বন্ধ ও কোন্দল লেগেই রয়েছে। ঘটছে পরস্পরের বিরুদ্ধে পাল্টপাল্টি সশস্ত্র মহড়া। পরিবেশবাদী সংগঠন ওয়াটার্স কিপার্স বাংলাদেশ’র মোংলার সমন্বয়কারী ও কেন্দ্রিয় সদস্য শেখ মোঃ নূর আলম বলেন, সুপেয় পানির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত পুকুরগুলোতে মাছ চাষের অনুমতি দেয়া সম্পূর্ণ অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। তিনি অবিলম্বে ইজারা প্রথা বাতিল করে সুপেয় পানির উৎস ধরে রাখতে পুকুরগুলোকে পৌরসভার কাছে হস্তান্তরের দাবি জানান। এদিকে শনিবার মোংলা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে স্থানীয় সাংসদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের উপস্থিতি অনুষ্ঠিত এক নাগরিক সংলাপে সুপেয় পানির উৎস ধরে রাখতে বাগেরহাট জেলা পরিষদ ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা পুকুরগুলোর ইজারা প্রথা বাতিলসহ এগুলো সংস্কারের জোর দাবি জানানো হয়। এ দাবির সাথে খোদ প্রতিমন্ত্রী একাত্মতা ঘোষণা করে সুপেয় পানির পুকুরগুলোর ইজারা প্রথা বাতিলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) কাজী আবেদ হোসেন বলেন, বন্দরের পুকুর ইজারা দেয়া ও মাছ চাষকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ অবগত হয়েছেন। এ সংকট নিরসনে আগামী মঙ্গলবার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে। সে পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের পুকুর থেকে মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button