জাতীয় সংবাদ

বাজার সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট রোধে ডিসিদের কঠোর হওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন ২০২৬’-এর উদ্বোধন

প্রবাহ রিপোর্ট : নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি জোরদার এবং কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সামাজিক স্থিতি ও জনগণের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রবিবার (০৩ মে) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অয়োজিত ‘জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসকদের জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবেই হয়রানি বা বিলম্বের শিকার না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাজার স্থিতিশীল রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘ইচ্ছে মতন যাতে কেউ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়াতে না পারে, কিংবা যে টেন্ডেন্সিটি আমরা দেখি বিভিন্ন সময় মজুদদারি বা কারসাজির মাধ্যমে বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে, কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা কেউ করতে না পারে এইজন্য নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।’
কৃষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কৃষক যেন ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় এবং সার, বীজ ও সেচ সুবিধা সহজলভ্য হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিকে কেবল উৎপাদন হিসেবে নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দেন তিনি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ধ্যা ৭টার পর বিভিন্ন মার্কেট প্লেসগুলোতে যাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার না হয়, সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসকদের খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা আরও কার্যকর, নিয়মিত ও দৃশ্যমান করার নির্দেশ দেন তিনি।

সরকারি কার্যালয়ে সেবা প্রার্থীদের হয়রানি বন্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি কার্যালয়ে সেবা প্রার্থীরা যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানি না হয় কিংবা বিলম্ব বা অনিয়মের শিকার না হয় দয়া করে সে ব্যাপারেও আপনাদেরকে কঠোর নজর রাখতে হবে।’ জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি সহজ করা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাকে ডিসিদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন, মাদক নিয়ন্ত্রণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং বাল্যবিবাহ ও নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অবস্থানের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ডিসিদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধেও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির তাগিদ দেন তিনি।
তরুণ সমাজকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করতে বছরজুড়ে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুধু নির্দিষ্ট দিবস বা ঋতুতে সীমাবদ্ধ থাকবে? তিনি জেলা প্রশাসকদের পরামর্শ দেন যাতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও খেলাধুলা সারাবছর চালু রাখা হয়। তরুণদের শারীরিক ও মানসিক এনার্জি সঠিক পথে চালিত করতে জেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও অডিটোরিয়ামগুলোকে কাজে লাগানোর নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি বলেন, সম্মেলনে ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার কার্যক্রম জোরদার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও ই-গভর্ন্যান্স, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনা হবে।
প্রধানমন্ত্রী সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য ভালো কাজের রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় স্বীকৃতির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, কোনো সাধারণ মানুষ যদি জীবন বাজি রেখে কাউকে উদ্ধার করে বা সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করে, তবে তাদের নাম কেন্দ্রে পাঠালে জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হবে। এমনকি ভালো পারফর্ম করা শিক্ষকদেরও পুরস্কার দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ছোটবেলায় যেসব সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ছিল, এখন তা অনেকটা অনুপস্থিত। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রকৃতির প্রতি দয়া এই মূল্যবোধগুলো ফিরিয়ে আনতে ছোট ছোট সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
একটি প্রযুক্তি নির্ভর, জ্ঞান ভিত্তিক ও নৈতিক রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই যেখানে ধর্ম, বর্ণ, মত বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য থাকবে না।’ ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, সমাজে হয়তো শতভাগ বৈষম্য দূর করা কঠিন, যেমন সোনায় কিছু খাদ থাকে, তেমনি মানুষের সমাজে সামান্য কিছু বৈষম্য থেকে যেতে পারে, তবে সরকার তা সর্বনি¤œ পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।
পরিশেষে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশের স্বার্থে সবার আগে বাংলাদেশ।’ এই বক্তব্যের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা প্রশাসক সম্মেলন ২০২৬-এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button