ইবির ৪৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে নৈরাজ্য ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তদন্তে কমিটি

কুষ্টিয়া থেকে রেজাউল করিম রেজা ঃ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পক্ষে গোপনে সংগঠিত হয়ে দেশব্যাপী নৈরাজ্যের প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেনÑএমন অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) প্রশাসন। কমিটিকে আগামী ১২ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগে ইবির ৪৪ জন শিক্ষকের নাম এসেছে। গত বুধবার (৫ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে কমিটি গঠনের বিষয়টি জানানো হয়। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকাশিত প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই, অভিযোগে সম্পৃক্ত শিক্ষকদের শনাক্ত, প্রয়োজনীয় সুপারিশ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে কমিটি কাজ করবে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেনকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান (আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ), অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম (আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানেল আইনজীবী ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. সাদাত হোসেন। সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন অর্থ ও হিসাব বিভাগের উপ-হিসাব পরিচালক ইসরাফিল হক। অফিস আদেশে অভিযোগে জড়িত শিক্ষকদের চিহ্নিত করে করণীয় নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় সুপারিশ এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগের বাস্তবতা অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামে টেলিগ্রামভিত্তিক একটি গোপন গ্রুপের মাধ্যমে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এ নেটওয়ার্কের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামানকে সভাপতি এবং ড. মাহবুবর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, টেলিগ্রাম গ্রুপটির ২৮ পৃষ্ঠার স্ক্রিনশট থেকে ৪০৩ জন শিক্ষকের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। আরও কয়েকজন সদস্য সাংকেতিক নাম ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষকের নাম এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ড. মাহবুবর রহমান, কে এম শরফ উদ্দিন, শারমিন সুলতানা, অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক ড. সেলিনা নাসরিন, ড. মিজানুর রহমান, নাসিরুল হক, শফিকুল ইসলাম, ড. আজরান আজমী, অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, জয়, ড. তহিদুর রহমান, অঞ্জন কুমার রায়, অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন, আলতাফ রাসেল, মিনহাজুল হক, ড. আসাদুজ্জামান, আফরোজা সাথী ও অধ্যাপক ড. মাহবুব শুভ। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, তালিকাভুক্ত কয়েকজন শিক্ষক সাংকেতিক পরিচয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তালিকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য, দুজন উপ-উপাচার্য, দুজন ট্রেজারার এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও শিক্ষকের নাম রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ জন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৮ জন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২ জন, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮ জন এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন শিক্ষক এ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়। বরং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিচ্যুত, বরখাস্ত, বয়কট বা প্রশাসনিক বৈষম্যের শিকার শিক্ষকদের সাংবিধানিক অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। তিনি দাবি করেন, সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেই করা হয়েছে। তাই এটিকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘পূর্ববর্তী প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে চান না। তবে নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দল বা তাদের আদর্শিক অনুসারীরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলে এবং তার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে।’ বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ভূমিকা, প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।


