আওয়ামী সুপারিশে নিয়োগ ও ১৬০০ মিটার গায়েব : অভিযুক্তদেরই পদোন্নতির ‘পুরস্কার’

খুলনা ওয়াসায় আওয়ামী পূণর্বাসন!
নেপথ্যে বিতর্কিত ডিএমডি ঝুমার বালা
কর্মচারীদের ক্ষোভ ও শাস্তির দাবিতে স্মারকলিপি
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা ওয়াসার চারটি জোন থেকে প্রায় ১৬০০ পানির মিটার চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনার কোনো কূলকিনারা না হলেও, উল্টো অভিযুক্ত ও অদক্ষ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। পতিত সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সুপারিশে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে বড় পদে বসানোর প্রক্রিয়া চলায় সংস্থাটির ভেতরে-বাইরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, নিয়োগের সময় এসব কর্মকর্তাদের সুপারিশপত্রে স্পষ্টভাবে ‘আওয়ামী লীগ পরিবারের লোক’ হিসেবে উল্লেখ ছিল। বিগত সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো তাদের মাধ্যমেই পরিচালিত হতো। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পরও ওই সিন্ডিকেটটিই বহাল তবিয়তে রয়েছে এবং আগামী সোমবার (১৮ মে) বিশেষ পদোন্নতির মাধ্যমে তাদের পুরস্কৃত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পদোন্নতির তালিকায় যাদের নাম : বিতর্কিত এই পদোন্নতির তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য কর্মকর্তারা হলেন: খান সেলিম আহাম্মদ: মেগা প্রজেক্ট ডাইরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তাকে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদ আরমান সিদ্দিকী: তিনি মিটার চুরির তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। অভিযোগ আছে, তিনি দীর্ঘ সময়েও তদন্ত রিপোর্ট জমা না দিয়ে প্রকৃত দোষীদের আড়াল করেছেন এবং বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দিয়েছেন। তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। কামাল হোসেন: তাকেও একইভাবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।
আশেকুর রহমান : বর্তমান জোনাল কর্মকর্তা, যার জোন থেকে প্রায় ৮০০ মিটার গায়েব হয়েছে। এই মিটারগুলো সরিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে সহকারী প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী করা হচ্ছে।
রফিকুল আলম সরদার: বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের শীর্ষ পর্যায়ের এই নেতা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চলতেন। তার জোন থেকে ৬০০ মিটার চুরি হলেও তাকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।
বিপ্লব মজুমদার : ভা-ার কর্মকর্তা হিসেবে মিটার চুরির অন্যতম হোতা বলে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকেও সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।
বিশাল রাজস্ব ক্ষতি ও জনমনে প্রশ্ন : সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুধু যে ১৬০০ মিটার চুরি হয়েছে তা নয়; প্রতিটি মিটারে গড়ে প্রায় ১ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকার অধিক পানির বিল বকেয়া ছিল। সেই বকেয়া বিলের রেকর্ড নষ্ট করতেই মিটারগুলো ‘গায়েব’ বা চুরি দেখানো হয়েছে। এতে সরকারের কয়েক কোটি টাকার প্রত্যক্ষ রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। বিগত সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে কেন তড়িঘড়ি করে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।
আরো অভিযোগ রয়েছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ কামরুজ্জামান তার শিল্প মন্ত্রণালয় বদলি হওয়ার পরেও তিনি কোন রকম যাচাই-বাছাই না করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি দিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে খুলনা ওয়াসার সচেতন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, এই পদোন্নতি কার্যকর হলে সংস্থাটিতে দুর্নীতি ও অনিয়ম আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। অপরদিকে, খুলনা ওয়াসা’র উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ঝুমুর বালার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় শোক অবজ্ঞা, শৃঙ্খলা ভঙ্গ, জ্বালানি খাতে লুটপাট এবং কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা (উপ-সচিব, পরিচিতি নং-১৬২৩৯) হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে অপসারণ ও শাস্তির দাবি জানিয়েছে খুলনা ওয়াসা কর্মচারী ইউনিয়ন ও সাধারণ কর্মচারীবৃন্দ।
রাষ্ট্রীয় শোক অমান্য ও প্রীতিভোজের আয়োজন :
প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সরকার ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোক ও সাধারণ ছুটির দিনে ডিএমডি ঝুমুর বালা সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে দপ্তরে নিয়োগ বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ওই দিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা বা কালো পতাকা উত্তোলনের পরিবর্তে তিনি দপ্তরে প্রীতিভোজ ও মিষ্টি বিতরণের আয়োজন করেন বলে কর্মচারীরা জানান। এ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে, যা পরবর্তীতে জনরোষে রূপ নেয়।
জ্বালানি খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় ও ব্যক্তিগত কাজে গাড়ির ব্যবহার : সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি তোয়াক্কা না করে ঝুমুর বালা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনে ৪টি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্যমতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যেখানে প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি খরচ ছিল ২ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লক্ষ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের সিংহভাগই তাঁর ব্যক্তিগত ও আন্তঃজেলা যাতায়াতে ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ভুয়া বিল ও বেতন উত্তোলনের মহোৎসব :
অভিযোগে আরও বলা হয়, খুলনা ওয়াসা’র বোতলজাত পানি উৎপাদনকারী প্ল্যান্ট দীর্ঘ ৬ মাস বন্ধ থাকলেও আউটসোর্সিং কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রায় ১০ লক্ষ টাকা পরিশোধ দেখানো হয়েছে। এছাড়া ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে কোনো বৈধ টেন্ডার ছাড়াই ইনটেক পয়েন্ট, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও গাড়ি মেরামত খাতে কোটি কোটি টাকার ভুয়া বিল ভাউচার তৈরির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সম্পদ চুরি ও অপরাধীদের সুরক্ষা : প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যের ১২০০টি ফ্লো-মিটার চুরির ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ঝুমুর বালার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত না করে বরং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দিচ্ছেন। এমনকি বিগত সরকারের সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত অদক্ষ ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের আগামী ১৮ মে পদোন্নতির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করারও অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
পতিত সরকারের তকমা ও নিয়োগ বাণিজ্য : অভিযোগ রয়েছে, আগামী ১৮ মে (সোমবার) সাবেক সরকারের সারসংক্ষেপ ও মন্ত্রীদের সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্তদের পুনরায় পদোন্নতি দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। নথিপত্রে এই কর্মকর্তাদের ‘আওয়ামী লীগ পরিবার’ ও ‘স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, এদের মাধ্যমেই ৪০০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে। বিশেষ করে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে জার্মানি পাম্পের পরিবর্তে নি¤œমানের চীনা পাম্প বসানো এবং সুয়ারেজ প্রকল্পে পাথরের বদলে খোয়া ও বালুর বদলে কাদা মাটি ব্যবহারের মতো ভয়াবহ দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে।
পুরানো দুর্নীতির ইতিহাস ও দুদকের তদন্ত : ঝুমুর বালার বিরুদ্ধে কেবল খুলনা ওয়াসাতেই নয়, বরং পূর্ববর্তী কর্মস্থলেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাগেরহাট জেলা পরিষদে কর্মরত থাকাকালীন ২০ লক্ষ টাকার অনিয়মের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালিয়ে সত্যতা পেয়েছে বলে জানা গেছে।
কর্মচারীদের ক্ষোভ ও স্মারকলিপি :
ডিএমডি’র এ ধরণের কর্মকা-ে খুলনা ওয়াসা কর্মচারী ইউনিয়ন ও সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। ইতিপূর্বে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় কর্মচারীরা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তা ও রোশানলের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। তাঁরা অনতিবিলম্বে এই দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে অপসারণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।



