স্থানীয় সংবাদ

নৃশংস, পৈশাচিক, হৃদয়বিদারক!

নগরীতে সৎ পিতার হাতে দু’ শিশু ও শ্বাশুড়ি খুন
একমাত্র অভিযুক্ত রফিকুলকে খুঁজছে পুলিশ

স্টাফ রিপোর্টার : খুলনার সোনাডাঙ্গা এমএবারী সড়ক সংলগ্ন দারুল আমান মহল্লার একটি ভাড়া বাসা থেকে নানী ও দুই নাতির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার (৩০ মে) রাতে ওই এলাকার হাজী তমিজউদ্দিন সড়কের শরিফুল ইসলামের বাড়ির ভাড়াটিয়া ঘর থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন নানী বেবি বেগম (৫৫), নাতি শামীম ব্যাপারী (১৩) ও মুস্তাকিম ব্যাপারী (৪)। দ্বিতীয় স্বামী মাদকাসক্ত রফিকুল হাওলাদার কর্তৃক এই হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে বলে নিহত দুই শিশুর মা ফাতেমা বেগম মেরী অভিযোগ করেছেন।
সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে পারিবারিক বিরোধের কারণে এ হত্যাকান্ড ঘটেছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে সোনাডাঙ্গা থানার এস আই জিবেশ মন্ডল জানান, বেবি বেগমের মৃতদেহ খাটের নিচে এবং দু’ শিশুর একজনের মৃতদেহ ট্রাংকের উপর ও অপরজনের মৃতদেহ ওয়ারড্রপের ড্রয়ারে পাওয়া গেছে। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরীর পর ময়নাতদন্তের জন্য মৃতদেহগুলো খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, নানি ও দুই নাতিকে হত্যার ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। পারিবারিক বিরোধ ও দীর্ঘদিনের কলহ-ই এ নৃশংস হত্যাকা-ের মূল কারণ বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যাকা-ের ঘটনায় শিশুদের পিতা মাসুম বেপারী বাদী হয়ে সৎ পিতা রফিকুল হাওলাদারকে একমাত্র আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। তবে, ঘটনার একদিন পার হলেও অভিযুক্ত রফিক এখনও পলাতক রয়েছে।

নিহত শিশুদের মা ফাতেমা বেগম মেরী জানান, ওই বাসার একটি রুমে দ্বিতীয় স্বামী রফিকুল হাওলাদারকে নিয়ে তিনি বসবাস করেন। অপর রুমে তার প্রথম পক্ষের দু’সন্তানকে নিয়ে মা বেবী বেগম থাকেন। শনিবার সারাদিন মায়ের রুম তালাবদ্ধ থাকায় বিকালে মেরি ডাকাডাকি শুরু করে। ভেতর থেকে কোন সাড়া না পেয়ে সে তালা ভাঙ্গার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে তালা ভেঙ্গে মৃতদেহগুলো দেখতে পায়। পরবর্তীতে সিআইডির টীম এসে ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে।
মেরী আরও জানান, ৪ বছর পূর্বে প্রথম স্বামী মাসুম বেপারীর (৪৫) সাথে ডিভোর্স হয়। এর পর তাদের সন্তান শামীম এবং মুস্তাকিম মেরির মা বেবী বেগমের সাথে থাকতো। আর পাশের রুমে ২য় স্বামী রফিকুল হাওলাদারকে নিয়ে তিনি বসবাস করতেন।
তিনি জানান, তার স্বামী রফিকুল একজন ট্রাক ড্রাইভার। সে নিয়মিত মদ পান করতো। গত কয়েকদিন ধরে তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ চলছিল। রফিকুল এ হত্যার ঘটনা ঘটাতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন।
এদিকে ফাতেমা বেগম মেরির প্রথম স্বামী মাসুম বেপারীর অভিযোগ, বর্তমান স্বামী রফিকুল হাওলাদারের সাথে মেরির পরকীয়া ছিল। তার জের ধরেই তাদের মধ্যে ছড়াছড়ি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তার দুই সন্তানকে রফিকুল হত্যা করেছে বলে ধারনা করছেন তিনি।
অপরদিকে থানা পুলিশও প্রাথমিকভাবে এ ঘটনায় রফিকুল জড়িত বলে সন্দেহ করছে। পুলিশ রফিকুলকে ধরার জন্য অভিযান শুরু করেছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঈদের দিন রাতে ফাতেমা বেগম বেবির সঙ্গে অভিযুক্ত রফিকের পারিবারিক বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। ওই বিরোধের জেরে শাশুড়ি বেবি তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এর প্রতিশোধ শোধ নিতেই শাশুড়ি ও তার দুই নাতিকে হত্যা করে রফিক বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ৩০ মে রাত ২টা থেকে ভোর ৮টার মধ্যে এ হত্যাকা- ঘটে। এ সময় শাশুড়ি বেবী বেগম ও তার দুই নাতি ১৩ বছর বয়সী শামীম ও ৪ বছর বয়সী মোস্তাকিমকে চেতনানাশক মিশ্রিত খাবার খাইয়ে অচেতন করা হয়। পরে তাদের গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয় বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। হত্যার পর মরদেহগুলো ঘরের ভেতরে ওয়ারড্রপ ও ট্রাংকে লুকিয়ে রেখে ঘর তালাবদ্ধ করে পালিয়ে যায় অভিযুক্ত রফিক। দরজা খুলতে না পেরে স্থানীয়দের মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার পর শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘরের দরজা ভেঙে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করে। পরে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় নিহত শিশুদের বাবা মাসুম বাদী হয়ে সোনাডাঙ্গা থানায় রফিককে একমাত্র আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে ধরতে একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
এ বিষয়ে খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, প্রাথমিকভাবে রফিককেই এই হত্যাকা-ের জন্য সন্দেহ করা হচ্ছে। ঈদের দিন রাতে মেরির মা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন এবং শাশুড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো ছিল না। বাচ্চাদের সঙ্গেও তার বিরোধ ছিল। এসব কারণেই তাদেরকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ২৯ তারিখ রাত ২টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে হত্যাকা- সংঘটিত হয়। এর আগে খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক দেওয়া হয়, যাতে ভুক্তভোগীরা চিৎকার করতে না পারে। পরে তাদের গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয়। সন্দেহভাজন রফিককে গ্রেফতারে একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
এদিকে এ ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয়রা দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button