খুলনা এখন রক্তাক্ত নগরী : ১৭ মাসে ৫১ খুন

# গড়ে প্রতি মাসে ৩ খুন #
# জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে শতাধিক খুন : কেসিসি প্রশাসক মঞ্জু #
# মাদক, আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিশোধের বলি নগরবাসী Ñ পুলিশের নজরদারি জোরদারের দাবি
কামরুল হোসেন মনি :
খুলনা মহানগরী যেন দিন দিন খুন, সন্ত্রাস ও মাদকের নগরীতে পরিণত হচ্ছে। শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত এ শহরে একের পর এক হত্যাকা-ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধ, পারিবারিক কলহ, রাজনৈতিক বিরোধ ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসে মহানগরীর আট থানায় ১৬টি হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৪টি। এর আগে ২০২৫ সালে পুরো বছরজুড়ে কেএমপি এলাকায় ৩৭টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ গত ১৭ মাসে অন্তত ৫১টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে।
একই পরিবারের তিনজনকে হত্যা ঃ চলতি বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও হৃদয়বিদারক হত্যাকা- ঘটে গত ৩০ মে রাতে। নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার তমিজ উদ্দিন সড়কের দারুস সালাম মহল্লার একটি ভাড়া বাসা থেকে বৃদ্ধা বেবী বেগম (৫৫), তার নাতি শামিম (১৩) ও মুস্তাকিমের (৪) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই পরিবারের তিন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পুরো খুলনায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ। হত্যার পর থেকেই প্রধান সন্দেহভাজন রফিকুল ইসলাম পলাতক রয়েছে। নিহত শিশুদের বাবা মাছুম ব্যাপারী বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। স্থানীয়দের ধারণা, পারিবারিক কলহ ও বিদ্বেষ থেকেই এ হত্যাকা- সংঘটিত হতে পারে।
৫ মাসে ১৬ হত্যা, ২০২৫ সালে ৩৭ ঃ কেএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) গোলাম মোহাম্মদ বলেন, “চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মহানগরীতে ১৬টি হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি মামলা হয়েছে।” তিনি জানান, চলতি বছরে খুলনা সদর থানায় তিনটি, সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় একটি, লবণচরা থানায় দুটি, হরিণটানা থানায় একটি, খালিশপুর থানায় দুটি, দৌলতপুর থানায় তিনটি, আড়ংঘাটা থানায় একটি এবং খানজাহান আলী থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “২০২৫ সালে কেএমপি এলাকায় ৩৭টি হত্যাকা- সংঘটিত হয়। ওইসব ঘটনায় ৩৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল।” পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের হত্যাকা-গুলোর মধ্যে ১৩টি ঘটেছে মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। এছাড়া পারিবারিক কলহে ছয়টি, প্রেমঘটিত কারণে দুটি, পরকীয়ার জেরে দুটি, ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে দুটি, ইজিবাইক চুরির ঘটনায় দুটি এবং বিভিন্ন কারণে বাকি হত্যাকা- ঘটে।
আদালতের সামনে জোড়া খুন, এখনও অমীমাংসিত রহস্য :
২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকা- ছিল খুলনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে দুই শীর্ষ অপরাধী হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজন হত্যা। প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এ হত্যাকা-ের পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও হত্যার প্রকৃত রহস্য এখনও পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি। পুলিশ সূত্র জানায়, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা না হওয়ায় তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে। যদিও একজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক এবং র্যাবও একজনকে আটক করেছে, তবুও হত্যার নেপথ্যের মূল কারণ এখনও স্পষ্ট নয়।
“মাদক ও প্রতিশোধই অধিকাংশ খুনের কারণ” ঃ কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান বলেন, “বর্তমানে যেসব হত্যাকা- ঘটছে তার অধিকাংশই মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে হচ্ছে।” তিনি বলেন, “একজন আরেকজনের সঙ্গে প্রতারণা করছে, পরে প্রতিশোধ হিসেবে হত্যাকা- ঘটছে। অনেক আসামি গ্রেফতারের পর জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।” তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘গত ২ জুন রাশেদ নামের একজনকে প্রতিপক্ষ কুপিয়ে হত্যা করে। এর আগে সে কয়েকটি মামলায় জেলে ছিল। জামিনে বের হওয়ার পর প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেয়।” তিনি আরও বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কেএমপির আট থানা এলাকায় ২৫টি পয়েন্টে নিয়মিত চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া আটটি মোবাইল টিম কাজ করছে।” শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিষয়ে তিনি বলেন, “কেএমপির তালিকাভুক্ত গডফাদারদের মধ্যে অধিকাংশকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে রনি চৌধুরী বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবু ও আশিক গ্রুপের প্রধান আশিক এখনও গ্রেফতার হয়নি।”
“অস্ত্র থাকলেও ব্যবহার করতে পারছে না পুলিশ” ঃ নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “সন্ত্রাসীদের হাতে এখন অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু পুলিশের কাছে অস্ত্র থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করার অনুমতি বা সুযোগ থাকে না।” তিনি বলেন, “গ্রেফতার হওয়া সন্ত্রাসীরা দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বেশিরভাগ হত্যাকা-ই আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ঘটছে।” তিনি আরও দাবি করেন, আদালত এলাকায় সংঘটিত জোড়া হত্যাকা-ের সঙ্গে কুখ্যাত ‘রনি চৌধুরী বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবু গ্রুপ’ জড়িত থাকতে পারে। খুলনা কারাগারে বাবু গ্রুপ ও পলাশ গ্রুপের সদস্যদের সংঘর্ষের জের ধরে প্রতিশোধমূলক এ হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে শতাধিক খুন ঃ খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু গত ৩১ মে খুলনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত ঈদ পুর্নমিলণী অনুষ্ঠানে বলেন, “খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে শতাধিক খুন হয়েছে। নদীতে লাশ ভাসছেÑএমন সংবাদও প্রকাশ হয়েছে।” তিনি বলেন, “খুলনায় মাদকের সয়লাব চলছে। মাদকের বিস্তার বন্ধ করতে হবে। পুলিশ প্রশাসন কাজ করছে, বিভিন্ন এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু তারপরও হত্যাকা- থামছে না।” এসব বিষয়ে স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আমি কথা বলেছি,তাকে খুলনায় আসার জন্য আমন্ত্রন জানিয়েছি।
আতঙ্কে সাধারণ মানুষ ঃ ক্রমাগত হত্যাকা-ে নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। বিশেষ করে অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া খুলনার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।



