খুলনায় অপরাধের লাগামহীন দৌরাত্ম্য : আতঙ্কে জনজীবন

# ১৪ দিনে ২ খুন, ৩ জন গুলিবিদ্ধ
# ‘মসজিদে গুলিবর্ষণ, বিএনপি নেতা হত্যা, কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যাসহ একাধিক ঘটনায় উদ্বেগ : পুলিশের অভিযানের মধ্যেও থামছে না সহিংসতা’
কামরুল হোসেন মনি ঃ চলতি জুন মাসের মাত্র ১৪ দিনেই খুলনা মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত দুইজন নিহত এবং তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একই সময়ে সংঘটিত হয়েছে একাধিক সশস্ত্র হামলা, কুপিয়ে হত্যা ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা। ধারাবাহিক এসব সহিংসতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে সর্বশেষ মসজিদের ভেতরে ফজরের নামাজ চলাকালে দুই মুসল্লিকে গুলি করার ঘটনা খুলনাজুড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকলেও অপরাধের লাগাম টানা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। নগরবাসীর প্রশ্ন, একের পর এক হত্যাকা- ও হামলার ঘটনায় অপরাধীরা কীভাবে এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে খুলনায় অন্তত পাঁচটি বড় সহিংস ঘটনার খবর প্রকাশ্যে এসেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন দুইজন এবং আহত হয়েছেন অন্তত তিনজন। ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মসজিদে গুলিবর্ষণ, রাজনৈতিক নেতাকে গুলি করে হত্যা, আরেক রাজনৈতিক নেতার ওপর হামলা, কুপিয়ে হত্যা এবং পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ।
মসজিদে ঢুকে গুলি
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে রোববার ভোরে মহানগরীর দৌলতপুর থানার পশ্চিম কাশিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদে। ফজরের নামাজ চলাকালে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই সশস্ত্র ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি লোকমান হাকিমকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় পাশে থাকা মুসল্লি আলম ম-লও গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ দুজনের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ধর্মীয় উপাসনালয়ের ভেতরে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর হামলার ঘটনায় এলাকায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে পূর্বশত্রুতার জের ধরে এ হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীদের মধ্যে মোটরসাইকেলচালক হেলমেট পরা ছিলেন এবং পেছনে বসা ব্যক্তি ধর্মীয় পোশাক পরেছিলেন। ঘটনাটির রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের শনাক্তে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।”কেএমপির সহকারী কমিশনার (সিটিএসবি) মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। হামলার কারণ ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত শুরু হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।”
দুই দিন আগেই খুন বিএনপি নেতা ঃ মসজিদে হামলার মাত্র দুই দিন আগে, ১২ জুন নগরীর দক্ষিণ লবণচরা এলাকায় বিএনপি নেতা গাজী রফিক ওরফে ঢাকাইয়া রফিককে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বাড়ির বাইরে ছেলেকে খুঁজতে বের হলে হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।এই হত্যাকা-ের সময়ও কেএমপির বিশেষ অপরাধবিরোধী অভিযান চলছিল। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ঃ এর আগে ৭ জুন পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নে হাসান ওরফে কিং (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। নিহতের পরিবারের দাবি, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলাকারীরা তাকে বেঁধে নির্মমভাবে মারধর করে হত্যা করেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও এলাকায় উপস্থিত ছিলেন।তবে স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, এ ঘটনার পেছনে আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসাকেন্দ্রিক বিরোধের সম্পর্ক থাকতে পারে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় নানা আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এ ঘটনায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে র্যাব-৬ অভিযান চালিয়ে হত্যাকান্ডে মামলার আসামি মো: নাজমুল হুদাকে গ্রেফতার করেছেন।
গুলিতে আহত বিএনপি নেতা :
৩ জুন রূপসা উপজেলার তালতলা এলাকায় বিএনপি নেতা শাহিনুর শেখ দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন। স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলে এসে হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। একটি গুলি তার উরুতে বিদ্ধ হয় এবং আরেকটি মাথা ঘেঁষে চলে যায়। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা :
২ জুন মহানগরীর লবণচরা এলাকায় মো. রাশেদ কাজী (২০) নামে এক যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ বলছে, পূর্বের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকা- সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। এর আগে একই পরিবারের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটেছিল বলে জানা গেছে।
বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা ঃ
স্বল্প সময়ের মধ্যে ধারাবাহিক খুন, গুলিবর্ষণ ও সশস্ত্র হামলার ঘটনায় খুলনা মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় উপাসনালয়ের ভেতরে গুলির ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, অপরাধীরা এখন আর কোনো স্থান বা পরিস্থিতিকেই তোয়াক্কা করছে না।
নগরবাসীর অভিযোগ, প্রায় প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত ও গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেওয়া হলেও অপরাধের পুনরাবৃত্তি থামছে না। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত উন্নয়ন নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে।
কী বলছেন সমাজবিজ্ঞানীরা ঃ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. সেলিনা আহমেদ বলেন, “সমাজে নৈতিক অবক্ষয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে সংস্কৃতিগত পরিবর্তনও অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। ইন্টারনেট, মোবাইল প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষের জীবনযাত্রা ও চিন্তাধারায় দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ খুব সহজেই সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকা-ের নানা চিত্রের মুখোমুখি হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু আইন প্রয়োগ করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠন ও তরুণদের ইতিবাচক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ বাড়াতে হবে।”

