খুলনার দৌলতপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাবলা পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকের সেবায় খুশি ৭৩৭ গর্ভবতী মা

# বিনামূল্য পরিবার পরিকল্পনার জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রীর সংকটে সেবা প্রত্যাশীরা #
# সংশ্লিষ্টরা বলছেন : দ্রুত সময়ের মধ্যে সংকট কেটে যাবে, ফিরবে স্বস্তি #
মো. আশিকুর রহমান : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রনালয়ের অর্ন্তভূক্ত খুলনা দিঘলিয়া উপজেলা নিয়ন্ত্রিত দৌলতপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাবলা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকে সেবার মান বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে সেবা গ্রহীতারা। দৌলতপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি ১৯৯১ সালে স্থাপিত। এতদাঞ্চলের সল্প আয়ের মানুষের পরিমিত স্বাস্থ্য সেবার প্রদানের অঙ্গিকার নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রা শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দিঘলিয়া উপজেলা নিয়ন্ত্রিত মোট ১২ টি ইউনিয়নে গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন ও প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্য সেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, বিনামূল্য জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রী বিতরনসহ কিশোর-কিশোরীদের কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কে সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। ওই ইউনিয়ন গুলো হলো দিঘলিয়া, সেনহাটি, গাজীরহাট, বারাকপুর, আড়ংঘাটা, যোগীপোল, কেসিসি এলাকার বয়রা, গোয়ালপাড়া, উত্তর খালিশপুর, দক্ষিন খালিশপুর, মহেশ^রপাশা ও পাবলা। ওই ১২ টি ইউনিয়নের মধ্যে দিঘলিয়া, বারাকপুর, গাজীরহাট ও আড়ংঘাটা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব সেবাও প্রদান করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপশাখা পাবলা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকে প্রতিমাসে গড়ে ৬০ জন করে চলতি বছরে (জুন ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬)’র ২৫ জুন (বৃহ্স্পতিবার) ৭৩৭ জন গর্ভবর্তী মায়ের গর্ভকালীন সেবা প্রদান প্রদান করেছেন। সূত্রটি আরও জানিয়েছে, গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন সেবা দিতে প্রথমেই গর্ভবতী মাকে গর্ভকালীন একটি নিবন্ধনসহ গর্ভবতী সেবা কার্ড প্রদান করা হয়। এরপর স্বাস্থ্য সেবা হিসাবে গর্ভের ৪ মাসের মধ্যে প্রথম চেক-আপ, গর্ভের ৬ মাসের মধ্যে ২য় চেক-আপ, গর্ভের ৮ মাসের মধ্যে ৩য় চেক-আপ এবং গর্ভের ৯ মাসের মাসে সর্বশেষ ৪র্থ চেক-আপ করা হয়। চেক-আপের সাথে সাথে প্রয়োজনীয় মেডিসিন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে তাও প্রয়োগের পরামর্শ প্রদান করা হয়। গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে তাৎক্ষনিক দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা খুলনার কোনো সরকারি হাসপাতালে রেফার করা হয়। প্রত্যেক গর্ভবতী মাকে নিরাপদ ডেলিভারি (প্রসব)’র জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়। একই সাথে প্রসব পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণরোধে মাকে এক ডোজ মিসোপ্রোস্টল ও নবজাতকের নাভি সংক্রমনরোধে ৭.১% ক্লোরোহেক্্িরডিন বিনামূল্য ওই গর্ভবতী মাকে গর্ভের ৭ মাসে বা ৩য় চেক-আপের সময়ে প্রদান করা হয়। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটি বিনামূল্য পরিবার পরিকল্পনা জন্মনিয়ন্ত্রনে সামগ্রী বিতরণসহ কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সেবার বিষয়েও কাউন্সিলিং করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক ও পরিবার কল্যান সহকারীর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। উক্ত, প্রতিষ্ঠানটিতে গর্ভকালীন সময়ে সার্বিক বিষয়ে সেবা ও পরামর্শ পেয়ে ওই সকল গর্ভবতী মায়েরা খুশি ও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। এদিকে, সম্প্রতি খুলনা দিঘলিয়া উপজেলা নিয়ন্ত্রিত দৌলতপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাবলা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকে আসা সেবা প্রত্যাশীরা বিনামূল্য প্রদানকৃত পরিবার পরিকল্পনার জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রী যেমন- জন্ম নিয়ন্ত্রন ইনজেকশন, কনডম, জন্ম নিয়ন্ত্রন পিল, মহিলাদের দীর্ঘ মেয়াদী জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি (কপারাটি), ডিডিএস কিট, এমনকি গর্ভবতী মায়ের নিবন্ধন কার্ডের সংকটের দরুন অল্প আয়ের মানুষেরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা দীর্ঘ সময় ধরে এসব সামগ্রী পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেছেন। তবে, মাঝে মধ্যে ওই সকল সামগ্রী পেলেও প্রয়োজনের তুলনায় কম পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ তুলেছেন। সেবা গ্রহীতাদের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাবৃন্দ বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনার জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রী সরবরাহের ঘাটতি থাকায় খুলনার জেলার বিভিন্ন উপজেলা সমূহে বিনামূল্য প্রদানকৃত পরিবার পরিকল্পনার জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রী সাময়িক সংকট দেখা দেয়। তথাপীও, বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও বিভিন্ন উপজেলা সমূহে ওইসব সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। ইতোমধ্যে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলা সমূহে বিনামূল্য প্রদানকৃত পরিবার পরিকল্পনার জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রী সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে চাহিদা অনুসারেও সরবরাহসহ প্রদান করা হবে বলেও জানান। পাবলা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা গৃহিনী গাইকুড় এলাকার বাসিন্দা আফরোজা অভিযোগ করে জানান, আমি দৌলতপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপশাখা পাবলা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক সর্ব সময় সেবা গ্রহন করে থাকে। আমি দুই সন্তানের জননী। অত্র ক্লিনিকে দীর্ঘদিন যাবৎ জন্ম নিয়ন্ত্রন পিল সরবরাহ বন্ধ আছে। মাঝে মধ্যে পাওয়া যায়, তাও আমার সীমিত। এখানে কর্তব্যরত সেবিকার কাছে পিলের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান খুব শীঘ্রই পাওয়া যাবে। আমরা বিনামূল্য এসব সামগ্রী পেয়ে থাকি। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব সামগ্রী সরবরাহের জন্য কর্তৃপক্ষের সু-দৃষ্টি কামনা করছি। ফুলবাড়ীগেট মীরেরডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা গর্ভবতী মা শামিমা সুলতানা জানান, আমার গর্ভকালীন সময় চলে ৬ মাস। এ সময়ের মধ্যে যে সব চেকআপ দরকার তা, পাবলা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক হতে গ্রহন করেছি। ওই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যথেষ্ট আন্তরিক। তারা বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পরামর্শ প্রদান করাসহ সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। সেবার মান খুব ভালো। দৌলতপুর আঞ্জুমান রোডের বাসিন্দা গর্ভবতী ডালিয়া সুলতানা জানান, দৌলতপুুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপশাখা পাবলা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকের সেবার মান খুবই ভালো। গর্ভকালীন সময়ে যে সকল সেবা ও পরামর্শ প্রয়োজন তা ওখান থেকে যথার্থ পাওয়া যায় এবং দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও যথেষ্ট আন্তরিক। এ ব্যাপারে দৌলতপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাবলা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকের পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা সামছুন নাহার জানান, আমার এই ক্লিনিক হতে চলতি বছরে ২৫ জুন পর্যন্ত ৭৩৭ জন গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন সেবা প্রদান করা হয়েছে। একই সাথে পরিবার পরিকল্পনা সেবাও প্রদান করা হচ্ছে। সাথে সাথে কিশোর কিশোরীদের স্বাস্থ্য সেবার ব্যাপারে কাউন্সিলিং করা হচ্ছে। চেষ্টা করছি এই সেবা কেন্দ্র হতে দৌলতপুরসহ আশপাশের অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা যেন নিশ্চিত করা যায়। পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, কয়েক মাস যাবৎ ওই সকল সামগ্রী সরবরাহ কম হচ্ছে। যখন যেভাবে আসে, সেভাবে বিতরণ করি। এ ব্যাপারে দৌলতপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাবলা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক অনুপ কুমার কুন্ডু জানান, চলতি বছরে অত্র ক্লিনিক হতে ৭৩৭ জন গর্ভবতী মাকে সেবা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে পরিবার কল্যান সহকারি নিয়মিত দম্পতি পরিদর্শনের কাজ করেন। ওই কর্মী গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত স্বাস্থ্য সেবার খোঁজ খবরসহ পরিবার পরিকল্পনার কাজ করে থাকেন এবং গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত ক্লিনিকে এসে গর্ভকালীন সেবা নেওয়ার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়ে থাকে, যা আমি নিয়মিত তদারকি করে থাকি, চেষ্টা করি সেবা প্রত্যাশিদের শতভাগ সেবা নিশ্চিত করার। তবে যদি আমাদের ক্লিনিকটি অবকাঠামো সংস্কারসহ পরিসরটি বড় হতো তবে, সেবা প্রত্যাশারা স্বাচ্ছন্দে সেবা নিতে পারতো বলে আমি মনে করি। এ ব্যাপারে দিঘলিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পলাশ কুমার বিশ^াস জানান, দিঘলিয়া উপজেলার অধিনে ১২টি ইউনিয়নে পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকে গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন ও প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্য সেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, বিনামূল্য জন্মনিয়ন্ত্রন সামগ্রী বিতরনসহ কিশোর-কিশোরীদের কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কে নিয়মিত সেবা প্রদান করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন কেন বিনামূল্য পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ কম থাকায় আমরাও কিছুটা প্রয়োজনের তুলনায় কম পেয়েছে। তবে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা হয়েছে দ্রুতই এ সমস্যার নিরসন হয়ে যাবে।
দৌলতপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাবলা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকে বিনামূল্য পরিবার পরিকল্পনার জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রী সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা জেলা পরিবার পরিকল্পনার উপ-পরিচালক আকিব উদ্দিন জানান, পরিবার পরিকল্পনার জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রীর সংকট ছিল, কিন্তু ইতোমধ্যে সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং আগামী ৩/৪ দিনের মধ্যে খুলনার প্রতিটি উপজেলায় ওই সকল সামগ্রী পৌছে যাবে। এছাড়াও আশাবাদী দ্রুত সময়ের মধ্যে চাহিদা মতো সামগ্রী সরবরাহও শুরু হবে।



