কালের গর্ভে হারাতে বসেছে কয়রার আদিবাসী মুন্ডাদের মাতৃভাষা : নেই কোন লিখিত বর্ণমালা

# আজ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস #
রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) ঃ উপকুলীয় জনপদ খুলনার কয়রা উপজেলার ৩ টি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী মুন্ডা সম্প্রদায়ের বসবাস। নানা প্রতিকুলতার মধ্যে দিয়ে প্রায় ৪ শ পরিবার এখানে টিকে আছে। তাদের সদস্য সংখ্যা ১ হাজারেরও বেশি। মুন্ডাদের নিজস্ব ভাষা ‘মুন্ডারি’। কিন্তু এর কোনো লিখিত রূপ নেই, কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে বর্ণমালা। শুধু মুখে মুখে প্রচলিত থাকলেও খাতা কলম থেকে নিজস্ব ভাষাও আজ বিলুপ্তির পথে। কয়রা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত বেশ কয়েকজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো ধরনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় হারিয়ে যাচ্ছে তাদের মাতৃভাষা। ভাষা রক্ষায় তাদের শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিসহ ভাষা সংরক্ষণ, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা। কয়রা সদরের নলপাড়া গ্রামের শায়ন্তি মুন্ডা বলেন, তিনি এক সময় বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় একটি পাঠশালায় মুন্ডা শিশুদের লেখা পড়া শিখাতেন। তবে সেখানে মুন্ডারি ভাষায় নয়, বাংলা ভাষায় মুন্ডা শিশুদের লেখাপড়া শেখানো হতো। এতে কিছুটা সমস্যা হলেও বাধ্য হয়ে মানিয়ে নিতে হতো। তবে মুন্ডারি ভাষা প্রচলন হলে লেখাপড়ার অংশ নেওয়া শিশুদের হার আরও বাড়ত বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব ভাষার কোনো বই নেই। ইন্টারনেট বা উইকিপিডিয়া থেকে তথ্য নিয়ে মুন্ডাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হয়। মুন্ডারি ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। তা না হলে এ ভাষা একসময় আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যাবে। উপজেলার ৬নং কয়রা গ্রামের বাসন্তী মুন্ডা বলেন, ‘মাতৃভাষা ধরে রাখার জন্য আমরা নিজেরা বাড়িতে সব সময় মুন্ডারি ভাষায় কথা বলি। তবুও আমাদের ভাষা রক্ষা করা যাচ্ছে না। বাংলার সঙ্গে ক্রমেই মিশে যাচ্ছে। মুন্ডা শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো এই ভাষা হারিয়ে ফেলবে। উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বলয় মুন্ডা আক্ষেপ করে বলেন, তিনি তার সন্তানদের সঙ্গে মুন্ডারি ভাষায় কথা বললেও তারা বাংলা ভাষায় উত্তর দেয়।
খুলনা জেলা জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিরাপদ মুন্ডা বলেন, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম তখন বাংলা ভাষা জানতাম না। স্কুলে যাওয়ার পর বাংলা ভাষা শিখেছি। স্কুলেও আমাদের ভাষা প্রয়োগ হয় না। এতে আমাদের ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে।’ তিনি জানান, মুন্ডারি ভাষা ভারতীয় আর্যভাষা থেকেও প্রাচীন। মুন্ডারি ভাষার চর্চা না থাকায় দিন দিন এ ভাষা বিলুপ্ত হতে চলেছে। এ ভাষায় শিশুদের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হলে ঝরে পড়ার হার অনেক কমে যেত। মুন্ডারি ভাষা সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি। কয়রা উপজেলার আইসিডির প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র আশিকুজ্জামান আশিক বলেন, তিনি এক সময় তার গ্রামে মুন্ডা শিশুদের লেখা পড়ার জন্য একটি বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। তবে ফান্ডের সমস্যার কারনে সেটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ আছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাদের ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে তিনি যথাযথ উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।



