স্থানীয় সংবাদ

খুলনার ‘ভৈরব সেতু’ নির্মাণ প্রকল্প : ৫ বছরে কাজের অগ্রগতি ২০%, বাড়ছে সময় ও খরচ!

# ৫ বছরে দৃশ্যমান হয়েছে মাত্র ১৭ টি পিলার, ব্যয় ৬১৭ কোটি টাকা
# কাজ বন্ধ দেড় বছর, ঠিকাদারকে ডজনখানের চিঠি, চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত
# নতুন ঠিকাদার নিয়োগ ও সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের কার্যক্রম চলমান

মো. আশিকুর রহমান : খুলনা জেলার দ্বীপবন্দী দিঘলিয়া উপজেলার মানুষের আর্থ-সামাাজিক সমৃদ্ধিসহ জীবনমান উন্নয়ন ও দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল ‘ভৈরব নদের উপর স্বপ্নের সেতু নির্মাণ’। চতুর্দিকে নদীবেষ্টিত এই দ্বীপ এলাকার বাসিন্দারের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন, একই সাথে খুলনা শহর সাথে দিঘলিয়া উপজেলা একত্রিত হওয়ার স্বপ্নের দ্বার উম্মেচিত হয় গত, ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয় ৬১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ভৈরব সেতু নির্মাণ প্রকল্প। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো ভৈরব সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কার্যাদেশের পর থেকে অদ্যাবদি ৫ বছর সময় অতিক্রম হলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০%। দীর্ঘ দেড় বছর সময় ধরে ঠিকাদার প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার দরুন কাজের অগ্রগতির উপর চরম প্রভাব পড়ে, যার দরুন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় ও খরচ দু’টিই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা, সেতুর কাজের অগ্রগতির ফেরাতে কয়েক দফায় সময় বৃদ্ধির পাশাপাশি কাজ শুরু করতে ঠিকাদারকে ডজনখানেক চিঠি প্রেরণ করেন, তথাপী মেলেনি সাড়া ও সুফল। সর্বশেষ, চুক্তি বাতিলের জন্যও ঠিকাদারকে চিঠি প্রেরণ করা হয়। অবশেষে, প্রকল্পের সব জটিলতা কাটিয়ে নকশা ও প্রকল্প সংশোধনের কাজ চলছে। দ্রুত সংশোধিত প্রকল্প উত্থাপন করা হবে একনেকে, সেটি নতুন করে অনুমোদিত হলে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে সেতুর পূর্নাঙ্গ কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন খুলনা সড়ক ও জনপদ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।
নাগরিক নেতারা বলছেন, সম্প্রতি সময়ে আমাদের দেশে প্রকল্প গ্রহন করে, তা বাস্তবায়ন না করাটা একটি সংস্কৃতিতে পরিনত হয়েছে। প্রকল্প গ্রহন করে কেন সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না, সরকারকে তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করাসহ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কঠোরভাবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। প্রতি বছরই উন্নয়নের নামে প্রকল্প গ্রহন করে বিপুল অর্থ ও সময় অপচয় হচ্ছে, উন্নয়নের নামে দুর্নীতি ও হরিলুট চলছে, একই সাথে জনগনের ভোগান্তির শেষ হচ্ছে না। জনগনের ভোগান্তির দায়ভার সরকারের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একটি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, বাঁচাতে হবে সময় ও অর্থ।
সূত্রে জানা গেছে, একনেক সভায় ভৈরব সেতু নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের পর বিভিন্ন কার্যক্রম ও দরপত্র প্রত্রিয়া শেষে ২০২১ সালের ২৪ মে দিঘলিয়াবাসীর স্বপ্নের ভৈরব সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ‘ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গত, ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তিনুসারে প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্নের কথা থাকলেও তৎকালীন সময়ে বৈশি^ক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রার্দুভাবের দরুন প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকায়, গত ২০২৪ সালের জুন পুনরায় প্রকল্পটির মেয়াদ দেড় বছর বাড়নো হয়। ওই নির্ধারিত সময়েও প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় আবারও চলতি ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়।
গত ৩০ জুনের অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৪ মে থেকে শুরু হওয়া ভৈরব সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কাজটির ৫ বছরে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। ৫ বছরে ৬১৭ কোটি টাকা নির্মাণ ব্যয়ের ভৈরব সেতুর কেবল মাত্র দৃশ্যমান হয়েছে ১৭ টি পিলার। অর্থ্যাৎ, সেতুর ২১টি পিলারের মধ্যে ১৭টির কাজ শেষ হয়েছে ৫ বছরে। অপরদিকে, অন্য ৪ টি পিলার সম্পন্ন করতে বসাতে হবে এখনো ৪০টি পাইল, যা এখনো শুরু হয়নি। এছাড়া সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়কের জন্য নদের দুই পারে সাড়ে ১৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এ জন্য বরাদ্দ ছিল ২৮১ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহনের কাজ অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল, তথাপী নির্ধারিত সময়ে স্থাপনা অপসারণ করে পুরো জমিই বুঝে নেয় সড়ক বিভাগ। জমি অধিগ্রহনের কার্যক্রম সম্পন্নের পরও দীর্ঘ দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে প্রকল্পের কাজটি, যা সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গসহ স্থানীয়দের চরম ভাবিয়ে তুলেছে।
সূত্রে আরও জানা গেছে, ভৈরব সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৬২ কোটি টাকা। তথাপী, গত দেড় বছর ধরে সেতুর কাজ বন্ধ রেখেছে ঠিকাদার। বাধ্য হয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ রাখায় প্রকল্পের খরচ বাড়ছে। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ ও সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে অন্তত ৬ মাস এবং কাজ শেষ হতে কমপক্ষে আরও ২ বছর সময় লাগবে। সর্বপরি, নতুন ঠিকাদার নিয়োগ ও সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া খুলনা জেলার দ্বীপবন্দী দিঘলিয়া উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ‘ভৈরব সেতুর’ অপেক্ষা আরও দীর্ঘতর হচ্ছে। দিঘলিয়াবাসী সকল জটিলতা কাটিয়ে তাদের স্বপ্নের ভৈরব সেতু বাস্তবরূপ দিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সেতু নির্মাণের জন্য ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তাদের ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু বৈশি^ক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রার্দুভাবের দরুন প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্পের মেয়াদ দেড় বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়, দুঃখজনক ওই নির্ধারিত সময়ে ঠিকাদার কাজ শেষ না পারার কারনে সর্বশেষ, চলতি ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়।
প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, প্রথম নকশায় নদের মাঝে দুটি পিলার ছিল। কিন্তু নদের মধ্যে পিলার বসালে পলি জমে নদী ভরাট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য নকশা সংশোধন করে নদের মাঝে দুটি পিলার সরিয়ে তীরে স্থাপন করা হবে। এতে স্টিলের মূল সেতুর দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ১৫১ মিটার, এছাড়া সেতুর দুই পাশে সীমিতগতির যান (ক্ষুদ্র যান) চলাচলের জন্য পৃথক লেন না থাকায় দুর্ঘটনার দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল। এসব বিষয় মাথায় রেখে নকশা সংশোধন করে দুই পাশে সেই লেন রাখা হয়েছে। এ জন্য সেতুর প্রশস্ততা দেড় গুণ বেড়ে ১০ দশমিক ৩ মিটার হয়েছে। মুহসীন মোড়ে রেললাইনের ওপর কংক্রিটের গার্ডার’র বদলে সেটি স্টিল করা হচ্ছে, ইতোমধ্যে সংশোধিত নকশা চূড়ান্ত হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চার লেনের মূল সেতুটি হবে ১৫১ মিটার। নৌ-যানের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখতে নদী থেকে প্রায় ৬০ ফুট উচুতে পিসি গার্ডার নকশায় সেতুটি নির্মাণ হবে। সেতুর সঙ্গে সড়কের সংযোগ স্থাপন করতে দুই পাশে তিন কিলোমিটারেরও বেশি উড়াল সড়ক (ভায়াডাক্ট) নির্মাণ হচ্ছে। এর মধ্যে খুলনা শহর প্রান্তে অর্থ্যাৎ, মহানগরীর দৌলতপুরস্থ মুহসিন মোড় পর্যন্ত ১ দশমিক ২৭ কিলোমিটার এবং উপজেলা দিঘলিয়া প্রান্তের নদ থেকে উপজেলা মোড় পর্যন্ত ২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এতেই পূর্বের তুলনায় অধিক খরচ বেড়েছে, বর্তমানে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ৬১৭ কোটি টাকা।
দৌলতপুর মুহসীন মোড় এলাকার ব্যবসায়ী আলমগীর জানান, দুই যুগ ধরে এই মুহসীন মোড় এলাকার ব্যবসা করছি। সেই ২০২১ সাল থেকে সেতুর কাজ শুরু হয়েছে। শুনে ছিলাম দুই বছরে কাজ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু, দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ। মুহসীন মোড় থেকে কিভাবে সেতু যাবে তা জানি না, আমার দোকান বাঁধবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কায় আছি। কারণ এটি আমার আয়ের একমাত্র উৎস।
দৌলতপুর রেলিগেট এলাকার বাসিন্দা মাসুদ জানান, ভৈরব সেতু নির্মাণের প্রথম দিকে সংশ্লিষ্টদের দৌঁড়-ঝাপের শেষ ছিল না। আমরা ভেবে ছিলাম এই সেতু সম্পন্œ হলে এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে। কিন্তু, কয়েক বছর কেটে গেলেও উল্লেখযোগ্য তেমন কাজ দৃশ্যমান হয়নি। কেবলমাত্র কয়েকটি পিলার চোখে পড়ে। এই এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে যথা সময়ে কাজ সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।
দিঘলিয়া উপজেলার পথবাজার এলাকার বাসিন্দা মো. আনিসুর রহমান জানান, ভৈরব সেতু আমাদের দিঘলিয়ার জনগনের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন, যা আজ দুঃস্বপ্নে শঙ্কায়। সেতুর কাজ শুরু হলেও নানা জটিলতায় বর্তমানে কাজ বন্ধ রয়েছে। এলাকায় গভীর রাতে কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে ফেরি পারাপারে আমাদের চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের স্বপ্ন পূরনে দ্রুত সময়ের মধ্যে সেতুর কাজ সম্পন্নের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র খুলনা জেলা সভাপতি এড. কুদরত-ই খুদা জানান, প্রথমেই কেন এই প্রকল্প বাস্তবায়ণ হলো না তার কারণ খুঁজে বের করে সরকারকে জবাবদিহিতার পাশাপাশি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। সম্প্রতি সময়ে আমাদের দেশে প্রকল্প গ্রহন করে, তা বাস্তবায়ন না করাটা একটি সংস্কৃতিতে পরিনত হয়েছে। যে কারনে প্রতি বছরই উন্নয়নের নামে প্রকল্প গ্রহন করে বিপুল অর্থ ও সময় অপচয় হচ্ছে, হচ্ছে উন্নয়নের নামে দুর্নীতি হরিলুট, একই সাথে জনগনের ভোগান্তির শেষ হচ্ছে না। জনগনের ভোগান্তির দায়ভার সরকারের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, সঙ্গত কারনে কেন এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলো না, তার কৈফত ও জবাবদিহিতা সরকারকে তলফ করতে হবে এবং দোষিদের চিহিৃত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং একই সাথে প্রকল্প গ্রহনের ক্ষেত্রে একটি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহন করলে সময় ও অর্থ দু’টির অপচয় রোধ হবে, কমবে দুর্নীতি বলে আমি মনে করি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে ভৈরব সেতু প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার মো. হেদায়েত উল্লাহ চৌধুরীকে মুঠো ফোনে একাধীক বার ফোন দিলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি (ফোন রিসিভ করেননি)।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, প্রকল্পের সব জটিলতা দূর হয়েছে। কিন্তু গত দেড় বছরে ডজনখানেক চিঠি দেওয়ার পরও ঠিকাদার কাজ করছেন না। এ জন্য চুক্তি বাতিলের জন্য তাঁকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নকশা ও প্রকল্প সংশোধনের কাজ চলছে। দ্রুত সংশোধিত প্রকল্প উত্থাপন করা হবে, অনুমোদন হলে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শুরু করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button