দাকোপের পানখালীতে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

এসডিজি ভিলেজ
স্টাফ রিপোর্টার : সরকারের এক ঘোষণায় খুলনা জেলার সমুদ্র উপকূলীয় জনপদ দাকোপের ছোট্ট পানখালি গ্রামের মানুষের মাঝে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। বিরাজ করছে সাজ সাজ রব। আজ সোমবার (১০ আগস্ট) টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পানখালী গ্রাম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দেশের তিনটি গ্রামকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের পানখালী গ্রাম, রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের মিতিঙ্গাছড়ি এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর গ্রাম।
এই সূত্র জানান, পাঁচ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পানখালী গ্রামের লোকসংখ্যা ৪ হাজার ৩৯৭ জন। ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। গ্রামে সাক্ষরতার হার ৭৩.২৯ শতাংশ। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৭০ ভাগ। গ্রামে চাষযোগ্য জমি ৫০০ হেক্টর। ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ এই শ্লোগানকে ধারণ করে পানখালী গ্রামের মডেল প্রোডাক্ট হিসেবে কাঁকড়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ফলে গ্রামবাসীর সামনে এখন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচন হতে যাচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, পানখালি মমতাজ বেগম মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এক হাজারের বেশি আমন্ত্রিত অতিথি এখানে উপস্থিত থাকবেন। ইতোমধ্যে সুবিশাল মঞ্চ ও প্যান্ডেল স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপনের জন্য ঢাকা থেকে টেকিনিশিয়ানরা এসেছেন। স্থানীয়ভাবেও ব্যাকআপ রাখা হচ্ছে। এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত। আর খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খাঁন ও খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল্লাহ হারুন ঢাকায় মূল অনুষ্ঠানস্থলে থাকবেন।
দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য বাস্তবায়নের আলোকে পানখালী গ্রামকে একটি আধুনিক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গ্রামে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দারিদ্র্য বিমোচন, জলাবদ্ধতা নিরসন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন, নারীর ক্ষমতায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, কৃষি ও জীবিকার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এদিকে, সরকাররের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে পানখালী গ্রামের মহিদুল শেখ, মৎস্য জেলে পরিমল রায়, কৃষক মাহবুবুর রহমান, অরবিন্দু মন্ডল, দিনমজুর আব্দুর রশিদ গাজী ও সাব্বির আহমেদসহ অনেকেই বলেন, গ্রাম হবে শহর, এটা ছিলো আমাদের দীর্ঘ বছরের এই লালিত স্বপ্ন। আজ আমাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান “এসডিজি ভিলেজ” হিসেবে ঘোষণা করবেন জেনে আমাদের পানখালী গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে উৎসব আর আনন্দের কমতি নেই।
তারা বলেন, অন্ধকারছন্ন এ গ্রামে বৈদ্যুতিক আলো ছড়াবে, গ্রামে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান হবে চতুরমুখি। কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষার আলো ছড়াবে এ গ্রামে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেকারত্ব দুর হবে। এছাড়াও মৌলিক সকল সুবিধাগুলো এ গ্রামে দেওয়া হলে এক সময় এ গ্রাম থেকেও সরকার অধিক রাজস্ব আদায়ের সুবিধা পাবেন। পানখালী গ্রামবাসীর স্বপ্ন এখন বাস্তবায়নের পথে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
পানখালি গ্রামকে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে উদ্বোধনকে সামনে রেখে প্রশাসনের তৎপরতাও বেড়েছে। খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল্লাহ হারুন গ্রামটি পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এর আগে জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. আরিফুল ইসলামও পানখালী গ্রাম পরিদর্শন করেন এবং প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন। এ উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ বোরহান উদ্দিন মিঠু।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এসডিজি ভিলেজ হিসেবে পানখালীকে গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামটির সার্বিক উন্নয়ন ও তরান্বিত হবে। এ গ্রামের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ তাদের ভবিষ্যত অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একক চিন্তা ধারার প্রতিফলনে এদেশ দুর্বর গতিতে এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি এটি দেশের অন্যান্য গ্রামের জন্য এটি অনুসরণযোগ্য উন্নয়ন মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তিনি মনে করেন।
পানখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের পানখালী গ্রামের ইউপি সদস্য শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রত্যাশিত ও লালিত স্বপ্ন পানখালী গ্রামকে এসডিজি ভিলেজ হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। এ কারণে গ্রামের বাসিন্দাদের মাঝে আনন্দের উৎসব সৃষ্টি হয়েছে।
পানখালী ইউপি চেয়ারম্যান শেখ সাব্বির আহম্মেদ বলেন, সরকারের এ মহান উদ্যোগে গোটা পানখালী ইউনিয়নবাসী স্বাগত জানাচ্ছেন। সমুদ্র উপকূলীয় এ উপজেলার সদর ইউনিয়নের পানখালী গ্রামকে এসডিজি ভিলেজ হিসেবে ঘোষনা হলে এ গ্রামের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। পানখালী গ্রামের প্রতিটি শ্রেণী পেশার মানুষ সবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি নানা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও আগ্রহী হয়ে উঠবেন।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আব্দুল্লাহ হারুন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ আগস্ট দাকোপের পানখালিতে এসডিজি গ্রাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন। সেখানেসহস্রাধিক লোকের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
পানখালী গ্রামকে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী’র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য (খুলনা-১) আমীর এজাজ খান বলেন, উপকূলীয় এই গ্রামের মানুষ সব ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে মোকাবেলা করে জীবন ধারণ করে। তাদের সামনে এখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে এ উদ্যোগের ফলে পিছিয়ে পড়া পানখালি গ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনমান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হবে। এটি সরকারের একটি মডেল প্রকল্প, যা পরবর্তীতে সারা দেশে বাস্তবায়ন হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।



