খুলনায় বাড়ছে ‘সাইবার ক্রাইম’

# ওয়াসার চেয়ারম্যানের ফোন হ্যাক, টার্গেট করা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিসহ ব্যবসায়ীদের
# রেহাই পাচ্ছে না সাধারন মানুষও, প্রলোভন ও সু-কৌশলে অর্থ আদায়ের প্রচেষ্টা
# সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের অপরাধ কার্যক্রমে উদ্বিগ্ন সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ
মোঃ আশিকুর রহমান ঃ খুলনা মহানগরীতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম, মাদক, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, জখম, খুনসহ নানামুখি অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রনে কাজ করছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। ওইসব অপরাধের তদন্ত ও রহস্যে উৎঘটনের পরিসমাপ্তিতে পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাদকের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছে, যা শক্তহাতে দমনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তারা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপ, উদ্বেগ ও দুঃচিন্তার বিষয় ওই সকল অপরাধের পাশাপাশি সম্প্রতি সময়ে খুলনায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সাইবার ক্রাইমের কার্যক্রম। আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির অপব্যবহার করে একটি সুশিক্ষিত ও বিশেষ প্রশিক্ষিত অপরাধী চক্র খুলনায় সাইবার ক্রাইমে লিপ্ত হয়ে নানামুখি অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নানা প্রলোভন, নতুন নতুন কৌশলে চোখের পলকে ভুক্তভোগীদের ফাঁদে ফেলে চক্রটি মুহুর্তের মধ্যে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ, ক্ষুণœ করছে সামাজিক অবস্থান। এছাড়াও চক্রটির ফাঁদে পড়ে প্রতিনিয়ত অনলাইনে পণ্যে কেনাকে কেন্দ্র করে প্রতারিত হচ্ছেন হাজারো ক্রেতা। একই সাথে সাইবার ক্রাইমে লিপ্ত চক্রটি ফিশিং লিংক ও ভূয়া প্রোফাইলের মাধ্যমে আইডি হ্যাক করে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূয়া ছবি, অশালীন ভিডিও, অডিও তৈরী করে ব্যবহারকারীকে ব্লাকমেইল করে অর্থ আদায়ের দাবি করার পাশাপাশি স¤œানহানীরও হুমকি প্রদান করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি সময়ে খুলনায় ভয়াবহ হচ্ছে সাইবার ক্রাইম। জড়িত অপরাধী চক্রটি খুলনার গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী ও সাধারন মানুষকে টার্গেট করে তাদের ব্যবহৃত ফোন নম্বর হ্যাক হোয়াটস্অ্যাপকে নিয়ন্ত্রন করে পরিচিত ব্যক্তিদের ম্যাসেজে প্রেরণ করে এবং ওটিপি গ্রহনের মাধ্যমে সু-কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে, যে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমান পাওয়া গেছে। একটি তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ডিজিটাল ডিভাইস বা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সাইবার ক্রাইমের কার্যক্রম চালাচ্ছে হ্যাকাররা। সাইবার ক্রাইমে য্ক্তু হ্যাকারা মোবাইল নম্বর বা সিম কার্ড সরাসরি হ্যাক করতে না পারলেও বিভিন্ন কৌশল ও প্রতারণার মাধ্যমে নাম্বারের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নেয়। সাধারণত প্রযুক্তিগত দূর্বলতা, ব্যবহারকারীর সচেতনতা এবং সামাজিক কৌশল ব্যবহার করে এই হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সূত্রটি বলছে, হ্যাকিংয়ের প্রধান মাধ্যমগুলো হলো- সিম সোয়াপিং, ফিশিং এবং ওটিপি প্রতারণা, স্পাইওয়্যার বা ম্যালওয়ার অ্যাপ, কল ফরওয়ার্ডিং ও ডাটা ব্রিচ বা সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রন করছে দীর্ঘদিন ধরে। বিভিন্ন সময়ে আইন-শৃৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনলেও থামছেনা সাইবার ক্রাইম বা ডিজিটাল অপরাধ। খুলনা সম্প্রতি সময়ে এ ধরনের অপরাধ সংগঠিত হওয়ায় উদ্বিগ্ন সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গসহ সচেতন মহল। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে সংগঠিত এ অপরাধ কার্যক্রমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের প্রতি। নাগরিক নেতারা বলছেন, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দেশে যে বিদ্যমান আইন রয়েছে, তা বারবার সংশোধনের কারণে অপরাধ দমনে পুরোপুরি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অনলাইনে অপরাধমূলক র্কমকা- ঠেকানোর জন্য জাতীয় পর্যায়ে কোনো কার্যকর মনিটরিং বা তদারকি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে অপরাধীরা সুযোগ নিয়ে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সাইবার ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদরে সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় সেল বা বিশেষজ্ঞ র্বোড গঠন করা প্রয়োজন। পুরো অনলাইন ব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় আনতে সরকারকে নতুন পরিকল্পনা গ্রহন করা উচিৎ। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, গত শুক্রবার (৭ আগষ্ট) সন্ধ্যায় খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান ও সাবেক কেসিসি মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি হ্যাক হয়। অতঃপর তার হোয়াটস্অ্যাপের মাধ্যমে বিকাশের দুটি নম্বর- (০১৬১৯-১৮৪৭০৮ ও ০১৮৭৬-২৯৯৮০৪) থেকে বিভিন্ন মানুষকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে নির্ধারিত নম্বরে টাকা পাঠাতে বলে। শুভাকাঙক্ষীদের মাধ্যমে জানতে পারেন তার ফোন নম্বরটি হ্যাক হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি সকল বিষয় উল্লেখ করে খুলনা সদর থানায় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করেন। গত, বুধবার (৫ আগষ্ট) সন্ধ্যায় বিশিষ্ট ওষুধ ব্যবসায়ী মো. হাফিজুর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ফোনযোগে জানতে পারেন তার ফোন নম্বরটি হ্যাক হয়েছে এবং ব্যবহৃত হোয়াটস্অ্যাপের মাধ্যমে পরিচিতদের ম্যাসেজের দ্বারা বিকাশ নম্বর- (০১৮৯২-৩৪২০৮৩) মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বলা হচ্ছে। ওই ঘটনার বিষয়ে তিনি আইনগত কার্যক্রম চলমান রেখেছেন। খুলনা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপকারভোগী (ভাতাপ্রাপ্ত) এক গৃহিনী জানান, আমি সাদামাঠা জীবন-যাপনে অভ্যস্ত। খুলনা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে বাচ্চার দুধের জন্য ভাতা পাই। নিয়মিত ভাতা পাচ্ছি কিনা জানতে ঢাকা অফিসের পরিচয় দিয়ে আমাকে এক ব্যক্তি ফোন দেয়। দু’মাস ভাতার টাকা পাচ্ছি না জানালে, ওই ব্যক্তি আইডিতে সমস্যা হয়েছে বলে ওটিপি পাঠায়। সমস্যা সমাধানের আশ^াস দিলেও ওটিপি নম্বর আমি বলি নাই। পরবর্তীতে স্বামীকে ঘটনাটি খুলে বলি, তিনি বিকাশের পিন চেঞ্জ করেন এবং পাশাপাশি আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করি। প্রতারণার শিকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী জানান, আমার শৈশবের বন্ধু বিদেশে থাকে। বিদেশ থেকে টাকা পাঠাতে দেরি হওয়ার ওই পরিবারকে বিভিন্ন সময়ে আমার আর্থিক সার্পোট দিতে হয়। হঠাৎ, একদিন আমার মোবাইল নম্বর হ্যাক হয়। পরবর্তীতে জানতে পারি হোয়াটস্ অ্যাপ থেকে আমার ভয়েজ ম্যাসেজ পাঠিয়ে তিনটি নাম্বারে পাঠানোর কথা বলা আমি নিজেই বলেছি নাকি। কি অদ্ভুত ব্যাপার, আমি তো হতবাক, হ্যাকাররা আমার আইডিতে ঢুকে আমার পূর্বের ভয়েস রেকর্ডিং করে বন্ধুকে পাঠিয়ে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। পরে ওই ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করি। এ বিষয়ে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকটে মোঃ বাবুল হাওলাদার জানান, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দেশে যে বিদ্যমান আইন রয়েছে, তা বারবার সংশোধনের কারণে অপরাধ দমনে পুরোপুরি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অনলাইনে অপরাধমূলক র্কমকা- ঠেকানোর জন্য জাতীয় পর্যায়ে কোনো কার্যকর মনিটরিং বা তদারকি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে অপরাধীরা সুযোগ নিয়ে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথাগত পুলিশ বা সিআইডি কাঠামোর বাইরে গিয়ে সাইবার ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদরে সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় সেল বা বিশেষজ্ঞ র্বোড গঠন করা প্রয়োজন। পুরো অনলাইন ব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় আনতে সরকারকে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে বলে আমি মনে করি। এই তদারকি ব্যবস্থা শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক না রেখে সমগ্র দেশে বিস্তৃত করা জরুরী। এতে একদিকে অপরাধ হ্রাস পাবে, অন্যদিকে অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে বলেও জানান এ নাগরিক নেতা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ণ সংস্থার সমান্বয়কারী এড. মোমিনুল ইসলাম জানান, সাইবার ক্রাইমের মাধ্যমে প্রতারণা করা, অর্থ হাতিয়ে নেওয়া আইনের দৃষ্টিতে একটি গুরুতর অপরাধ। সাইবার ক্রাইমে অভিয্ক্তু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হওয়ার পর তা আদালতে প্রমাণিত হলে, ওই অপরাধীর পাঁচ বছরের সাজা (জেল) ও পাঁচ লাখ টাকা অর্থদ-ের বিধান রয়েছে বলে জানান এই আইনজীবি। ভুক্তভোগী ওষুধ ব্যবসায়ী মো. হাফিজুর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে ছিলেন বুধবার সন্ধ্যায়, হঠাৎ হোয়াটস্অ্যাপে ঢুকতে পারছিনা। ম্যাসেজের মাধ্যমে পরিচিত ও আত্মীয় স্বজনদের কাছে অর্থ চাওয়া হয়েছে, যা আমার চরম ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। পরবর্তীতে ফোনযোগে জানতে পারি এমন নেক্কার ঘটনাটি। ওই ঘটনার বিষয়ে আইনগত কার্যক্রম চলমান রেখেছি। এ বিষয়ে খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান ও সাবেক কেসিসি মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, হ্যাকাররা সুকৌশলে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করে অপরাধ সংগঠিত করছে। সচেতনতার এই জায়গাটায় নানান কর্মব্যস্ততার কারণে সবসময় সচেতন থাকা সম্ভব হয় না। আমার ফোন নম্বর হ্যাকের ঘটনাটি আমার জন্য অত্যন্ত একটা দুশ্চিন্তার, পরিবারকেও ভীষণভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করেছে। সামাজিক, রাজনৈতিক স্তরে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করেছি। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছি, পুলিশ যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের কাজ করছে। তারা যে আসলেই কর্মক্ষম, সাইবার ক্রিমিনালদের তারা যে ধরতে পারে, শাস্তি দিতে পারে তার প্রমাণ মিলবে সাফল্যে। সর্বপরি, আমি মনে করি নিজস্ব ডিভাইসে প্রচুর সিকিউরিটি প্রয়োজন, পাশাপাশি দরকার সচেতনতারও। খুলনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যানের ফোন নম্বর হ্যাকের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট থানায় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দেখছি। এ ঘটনায় জড়িতদের শণাক্ত পূর্বক আইনগত পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রামই এন্ড অপারেশনস্্, ভারপ্রাপ্ত) এম এম শাকিলুজ্জামান জানান, খুলনায় প্রতিটি অপরাধ কর্মকা-ে জড়িতদের শণাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি, সাইবার ক্রাইম দমনে সাইবার ইনভেস্টিগেশন সেল আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সহয়তায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে আমরা বদ্ধ পরিকর, এ সংক্রান্তে আমাদের টিম নিয়মিত কাজ করছে। অপরাধীরা সম্প্রতি বিভিন্ন প্রলোভন ও নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কার্যক্রমে সক্রীয়। তিনি আরও জানান, পুলিশ জনগনের সেবা দেবে এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তথাপী এ অপরাধরোধে জনগনের সচেতনতার পাশাপাশি, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জনসাধারনের প্রতি মোবাইলের অপরিচিত নম্বর থেকে কল রিসিভ না করা, কোনো ডিজিটাল তথ্য প্রদান করা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে তথ্য দিয়ে সহয়তার অনুরোধ ও আহ্বান জানান এ কর্মকর্তা।



