গোয়েন্দা তথ্যে একের পর এক পণ্য চালান আটক, সিন্ডিকেটের যোগসাজশের অভিযোগ

বেনাপোল বন্দরে শুল্ক ফাঁকি ও অনিয়মের অভিযোগ
যশোর ব্যুরো ঃ দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে শুল্ক ফাঁকি ও পণ্য আমদানিতে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমস ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের একটি অসাধু চক্রের যোগসাজশে মিথ্যা ঘোষণা, এইচএস কোড পরিবর্তন, পণ্যের ওজন ও পরিমাণ কম দেখানো এবং ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য আমদানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
সম্প্রতি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে বেনাপোল বন্দরে একাধিক সন্দেহজনক পণ্য চালান আটক ও লক করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার সালমান ইন্টারপ্রাইজের একটি চালান ১২ নম্বর শেডে লক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পরীক্ষণ করছে। চালানটির ম্যানিফেস্ট নম্বর ৬০১২০২৬০০২০০৫০৮৫৫, তারিখ ২২ আগস্ট ২০২৬। এতে ৭১৪ প্যাকেজ অ্যাসোর্টেড ইমিটেশন পণ্য আমদানি দেখানো হয়েছে। ঘোষিত আমদানি মূল্য প্রায় ৩৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
চালানটিতে কাঁচের চুড়ি, ইমিটেশন জুয়েলারি, প্লাস্টিক চুড়ি, সোলার মালা ও জুয়েলারি এমটি বক্সসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। ভারতীয় দুটি গাড়িতে করে আসা চালানটির মোট ওজন দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার ২২৫ কেজি। পণ্যটির ঘোষণা ও শুল্কায়ন নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া ২৫ আগস্টের আরেকটি চালানে ভারতের বনগাঁর মা ইন্টারপ্রাইজ রপ্তানিকারক এবং ঢাকার তামান্না করপোরেশন আমদানিকারক হিসেবে রয়েছে। এ চালানের সিএন্ডএফ এজেন্টও একই প্রতিষ্ঠান বলে জানা গেছে। এসব চালানে ঘোষণাবহির্ভূত ও অতিরিক্ত পণ্য থাকার অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বেনাপোল কাস্টমস হাউজে একই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কায়ন হারে অসঙ্গতি রয়েছে। কারও পণ্য কম দরে এবং কারও একই পণ্য বেশি দরে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। এ নিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। ঢাকার চকবাজারের টিএল ট্রেডিংয়ের ৬৮৭ প্যাকেজের একটি চালানেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চালানটির ঘোষিত মূল্য ৪১ হাজার ৩০১ মার্কিন ডলার। এতে উচ্চ শুল্কের ইমিটেশন পণ্য রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি লক করা হলেও পরবর্তী পরীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রায় ২ হাজার ৪০ কেজি অতিরিক্ত পণ্যের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রকৃত অতিরিক্ত পণ্যের পরিমাণ আরও বেশি। অভিযোগ রয়েছে, পণ্য পরীক্ষণের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে না। ইমিটেশন জুয়েলারির মতো বিভিন্ন পণ্যের মাত্র একটি নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন নিয়ে চালান খালাসের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, একাধিক পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসত। এদিকে ৩১ আগস্ট ১৫ নম্বর শেডে ভারত থেকে আসা ৫৩৩ প্যাকেজের একটি চালানে ঘোষণাবহির্ভূত ছয় প্যাকেট পণ্য পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই চালানের ম্যানিফেস্ট নম্বর ৫২৪৪৩। কাস্টমস ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের যৌথ পরীক্ষায় এ অসঙ্গতি ধরা পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া টিএল ট্রেডিংয়ের ৬৪২ প্যাকেজের আরেকটি চালান, যার ওজন প্রায় ২৫ হাজার ৬০০ কেজি, কায়িক পরীক্ষার জন্য লক করে রাখা হয়েছে। চালানটির ম্যানিফেস্ট নম্বর ৫০৭৯০ এবং সিএন্ডএফ এজেন্ট সোহাগ ইন্টারন্যাশনাল। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সীমিত পরিসরে কায়িক পরীক্ষা ও দ্রুত পণ্য খালাসের মাধ্যমে অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের একটি চক্র জড়িত বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। বেনাপোল বন্দরের রাজস্ব আদায় ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বচ্ছ রাখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত, ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের মিল যাচাই এবং ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জিএসটিআইসহ প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।



