খুলনায় সহিংসতার লাগাম নেই

# গুলি-ছুরিকাঘাতে দুই খুন : নির্যাতনে আরও এক মৃত্যু ; হাতুড়িপেটায় গুরুতর আহত শ্রমিক নেতা #
কামরুল হোসেন মনি ঃ খুলনায় একের পর এক সহিংস ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে নগরী ও আশপাশের এলাকায় গুলি করে হত্যা, ছুরিকাঘাতে হত্যা, চুরির অপবাদে মারধরের পর মৃত্যু এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের এক শ্রমিক নেতাকে হাতুড়িপেটার ঘটনা ঘটেছে। পৃথক এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিনজন, গুরুতর আহত হয়েছেন একজন। সর্বশেষ শনিবার সকালে নগরীর দৌলতপুর থানাধীন কুলিবাগান মোড়ে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ইস্পাহানী জুট প্রেসের শ্রমিক জলিল মুন্সি (৩৫) নিহত হয়েছেন।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টার দিকে কুলিবাগান মোড়ে মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত জলিল মুন্সিকে লক্ষ্য করে পরপর দুই রাউন্ড গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় বলে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। গুলিতে তার বুক ও পিঠে আঘাত লাগে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। দৌলতপুর থানার ওসি (তদন্ত) মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, পুলিশের টহল দল দুর্বৃত্তদের ধাওয়া করলেও তারা পালিয়ে যায়। নিহত জলিল ইস্পাহানী জুট প্রেসের শ্রমিক ছিলেন। তিনি নেশাপানিতে জড়িত ছিলেন এবং তার কাছে চাঁদা দাবির বিষয়টি প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। মাদকসংক্রান্ত লেনদেনকে কেন্দ্র করে হত্যাকা-টি ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
এর মাত্র কয়েক দিন আগে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে সোনাডাঙ্গা থানাধীন তালুকদার কমিউনিটি সেন্টারের পেছনে মোস্তাকিন (২৮) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। কারা এবং কী কারণে তাকে হত্যা করেছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর চুরির অপবাদে মারধরের অভিযোগে গুরুতর আহত সাজমীর (২২) নামে এক যুবককে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) তার মৃত্যু হয়। স্বজনদের অভিযোগ, চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে ধরে নিয়ে লাঠি ও দা দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়েছিল। তবে সাজমীরের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে গত ৩১ আগস্ট রাতে রূপসার মিলকি দিয়ার এলাকায় শ্রমিক দল নেতা মো. রিপন আকন্দকে ধরে নিয়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ ওঠে। ছয়-সাতজনের একটি দল তাকে মারধর করে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ ও পূর্ববিরোধের জেরে হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
আগষ্ট মাসে ৫ হত্যাকা- :
গত ১২ আগস্ট রূপসার শ্রীরামপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে যুবদল কর্মী ফখরুল শেখ নিহত হন। এ ঘটনায় প্রধান শুটার ইব্রাহিম খলিল ওরফে কাটাপ্পাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৬। এর তিন দিন পর আইচগাতীর দুর্জনীমহলে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় জয় ঢালীকে। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ১৮ আগস্ট বাগমারে মামুন মীরকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। গুরুতর আহত মামুন বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন। পরদিন লবণচরার হরিণটানা আশিবিঘার বালুর মাঠে মনজুরুল ও নজমুল নামে দুই যুবক হত্যার শিকার হন। খুনের বিষয়ে মাদক ও আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি সামনে আসে। সর্বশেষ ২৬ আগস্ট দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশায় একটি ঘের থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মনিরুল ইসলাম রনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাকে হত্যার পর লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ধারণা পুলিশের।
কেএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্কে বলেন, মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তার বন্ধ করা গেলে হত্যাকা- অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে হত্যা, অস্ত্র ও মাদক মামলার আসামিরা সহজে জামিন পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরপর এসব ঘটনায় নগরী ও আশপাশের এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশ্য সড়ক ও জনবহুল এলাকায় অস্ত্রধারীদের হামলা এবং একের পর এক হত্যাকা-ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বাড়ছে। তবে পুলিশ বলছে, প্রতিটি ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।



