স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় জনবসতি এলাকায় শিল্পকারখানা

# শব্দ দুষণসহ পরিবেশ দূষণের অভিযোগ #
# পরিবেশ অধিদপ্তরের তিন দফা নোটিশ ৪৫ দিনের আল্টিমেটাম #

স্টাফ রিপোর্টারঃ খুলনা নগরীর আড়ংঘাটা এলাকায় জনবসতির মধ্যে গড়ে ওঠা একটি শিল্পকারখানার বিরুদ্ধে শব্দ, বায়ু ও পরিবেশ দূষণসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘ই-শানা ননওভেন ফেব্রিক্স লিমিটেড’ নামের কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রমে রাত-দিন শব্দ, আলো ও বায়ু দুষণ সৃষ্টি করছে। এতে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ও জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর বরাবর স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে কারখানাটির পরিবেশ দুষণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্য়ালয় শিল্প কারখানাটি দু’ দফা লিখিত নোটিশ করেছে। লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, আড়ংঘাটা থানাধীন বাইপাস সড়কের সঙ্গে তেলিগাতী দক্ষিণপাড়া জনবসতি এলাকায় কারখানাটি গড়ে উঠেছে। কারখানার বিকট শব্দ ও রাতের আলোয় এবং বায়ু দুষণে এলাকাবাসীর ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কারখানার কার্যক্রমের কারণে আশপাশের কৃষিজমি ও বসতবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, পুকুর ভরাট করে জনবসতি এলাকায় শিল্পকারখানা গড়ে তোলার কোন নিয়ম নেই। তার ওপর শব্দ, আলো ও বায়ু দুষণ মোটেও কাম্য নয়। পরিবেশ বিনস্টকারী এসব নিয়ম বন্ধ করতে তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আশুহস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, আগে ওই এলাকায় দু’টি বড় পুকুর ছিল। পুকুর দু’টি ভরাট করে সেখানে কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। একটি মৃতঃ হাবিবুর রহমানের অপরটি মৃতঃ অমূল্য মন্ডলের। দু’টি বেশ বড় পুকুর। তাদের দাবি, পুকুর ও আশপাশের জমি ভরাটের ফলে এলাকার পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানার কারণে কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে রাতভর কারখানা চালু থাকায় শব্দদূষণের মাত্রা বেড়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু করে বিকট শব্দে কম্পন সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, কারখানাটিতে শ্রমিকদের ১২ ঘন্টা কাজ করানো হলেও তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। কয়েকজন শ্রমিককে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগপত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, জমি কেনাবেচা এবং জনবসতি উচ্ছেদের আশঙ্কার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ধীরে ধীরে পুরো এলাকার জমি দখল বা ক্রয় করে শিল্পকারখানা সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। এতে ভবিষ্যতে ওই এলাকার কৃষিজমি ও বসতভিটা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা কারখানাটির পরিবেশগত ছাড়পত্র, জমির ব্যবহার, শব্দদূষণ বায়ু দুষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ডা. মনোরঞ্জন ম-ল, স্বপন ম-ল, জয়নাল আবেদীন । তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাফতুন মনোজ বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিরা এসে আমাদের কিছু নিদের্শনা দিয়ে গেছেন। আমরা সেই অনুযায়ি কাজ করছি। আমরা শব্দ দুষণ কমাতে ৬ মাসের সময়ও চেয়েছি। এই এলাকার ৮শ’ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে এ প্রতিষ্ঠানে। এখানে শিফটিং এর মাধ্যমে কর্মীরা কাজ করে। ফলে অতিরিক্ত সময় কাজ করার সুযোগ নেই। তবে কেউ যদি বেশি আয়ের জন্য ওভার টাইম কাজ করে সে জন্য আমরা কি করতে পারি। আমরা সরকারের সকল নিয়ম মেনে উৎপাদন করছি। অভিযোগকারী ডাঃ মনোরঞ্জন মন্ডল বলেন, এলাকার ৭/৮টি পরিবারকে কৌশলে উচ্ছেদ করে এ কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। দু’টি বড় পুকুর ছিল তা ভরাট করা হয়েছে। এতে করে এলাকাবাসী গোসল থেকে শুরু করে রান্না করা পানির কস্টভোগ করছে। কারখানার বিকট শব্দে এলাকাবাসী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে জেনারেটরের শব্দে এলাকায় কম্পন সৃষ্টি হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর তিন দফা নোটিশ করলেও মিল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না। অভিযোগকারী স্বপন মন্ডলের মাসহ অনেকেই কানে কম শুনছেন। মিল মালিক নানাভাবে ভয় ভীতি ও প্রভাব সৃষ্টি করছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় অফিসের সহকারি পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলামসহ অধিদপ্তরের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা শব্দ ও বায়ু দুষণের প্রমাণ পেয়ে দুষণের মাত্রা কমাতে আবারো নোটিশ করেছে। তিনি বলেন, কারখানাটি ৭৫ ডেসিবল শব্দ সৃষ্টি করছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় ১৫ ডেসিবল বেশী। এটা কমানোর জন্য তিন দফা নোটিশ দেয়া হয়েছে। আর বায়ু দুষণ রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। যদি তারা না নেয় তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান। ওই নোটিশে উল্লেখ “তেলিগাতী গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে তেলিগাতী পাঁচুলার ঘাট সিটি বাইপাস রোড, আড়ংঘাটা খুলনা-এ অবস্থিত ইশানা ননওভেন ফেব্রিক্স ইন্ডা, লিঃ নামক প্রতিষ্ঠান হতে মেশিন ও জেনারেটরের তীব্র ও লাগাতার শব্দ এবং এক্সস্ট ফ্যানের গরম বাতাস তাদের বসবাসকে অসহনীয় করে তুলছে মর্মে এলাকাবাসী কর্তৃক অত্র কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়। এ দপ্তর কর্তৃক কারখানার পাশ্ববর্তী বাড়িতে ৭৫ ডেসিবল শব্দ রেকর্ড করা হয়, যা শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য মানমাত্রার বাইরে রয়েছে। অভিযোগ ও সরেজমিন পরিদর্শনে অভিযোগের সত্যতার প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো বর্ধিতকরনের ব্যাখ্যা ও শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়। জবাবে আপনি ৮ মাস সময় লাগবে জানিয়েছেন, যা গ্রহনযোগ্য মর্মে প্রতীয়মান হয়নি। এ প্রেক্ষিতে, আগামী পঁয়তাল্লিশ কর্মদিবসের মধ্যে অনুমোদন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো বর্ধিতকরনের ব্যাখা ও আবদ্ধ/সাউন্ড প্রুফ কক্ষে জেনারেটর স্থাপন করাসহ শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনরায় নির্দেশনা প্রদান করা হলো একই সাথে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা পর্যন্ত উত্তর ও পূর্ব দিকের সকল জানালা ও এক্সষ্ট ফ্যান বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হলো। ব্যর্থতায় আপনার প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র বাতিলসহ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” গত ৭ সেপ্টেম্বর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক হারুণ অর রশিদ স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button