স্থানীয় সংবাদ

খুমেক হাসপাতালের বহিঃর্বিভাগে ১০ টাকার টিকিটে চিকিৎসা নিতে এসে হাজার হাজার টাকার পরীক্ষা

# সাধারন রোগীদের দূর্ভোগ চরমে #

খুমেক প্রতিনিধি ঃ শেখ মোঃ জাকির হোসেন ঃ মাত্র ১০ টাকার টিকিট কেটে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। অনেকের আশাÑস্বল্প খরচে চিকিৎসা পাবেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ পাবেন। কিন্তু সেই আশায় এসে যদি প্রেসক্রিপশনে ওষুধের পরিবর্তে একের পর এক ব্যয়বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা লেখা হয়, তাহলে অসহায় এসব রোগী যাবেন কোথায়? খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের ডি-কার্ডের ১০৬ নম্বর কক্ষে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কাছ থেকে এমনই অভিযোগ পাওয়া গেছে। রোগীদের অভিযোগ, ডি-কার্ডের মেডিকেল অফিসার পরিচয়ে ডা. মোঃ রাকিবুল হাসানকে দেখানোর পর অনেকের প্রেসক্রিপশনে কোনো ওষুধ না লিখে কয়েক হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে না করিয়ে নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করানোর পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
ডুমুরিয়া থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আশিকুর রহমান জানান, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তিনি ১০৬ নম্বর কক্ষে চিকিৎসকের কাছে যান। কিন্তু ওষুধের পরিবর্তে তাঁর প্রেসক্রিপশনে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার পরীক্ষা দেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে থাকা এক অ্যাটেন্ডেন্ট তাঁকে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন। মাত্র সাড়ে ছয় হাজার টাকা বেতনে চাকরি করা আশিকুরের প্রশ্নÑএত টাকা দিয়ে পরীক্ষা করানোর সামর্থ্যই বা কোথায়?
একই অভিযোগ বটিয়াঘাটার বারোয়ারী এলাকার আব্দুল্লাহর। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসার আশায় দূর থেকে এসে তিনিও পেয়েছেন প্রায় পাঁচ হাজার টাকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ। তাঁর অভিযোগ, এসব পরীক্ষাও একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করাতে বলা হয়েছে। আর জিরোপয়েন্ট এলাকার রোগী রোকেয়ার প্রেসক্রিপশনে লেখা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার টাকার পরীক্ষা। কোনো ওষুধ না পেয়ে তাঁর প্রশ্নÑস্বল্প আয়ের মানুষ যদি সরকারি হাসপাতালে এসেও হাজার হাজার টাকা খরচ করে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হন, তাহলে তাদের শেষ ভরসার জায়গাটি কোথায়?
অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধানের সময় ১০৬ নম্বর কক্ষ থেকে বের হওয়া একাধিক রোগীর প্রেসক্রিপশনে ওষুধের পাশাপাশি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার উল্লেখ দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে সিবিসি অ্যান্ড পিবিএফ, ইউরিনারি পরীক্ষা, ইসিজি, ইকো ডপলার, ট্রোপোনিন-আই অ্যান্টিজেন, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও সিরাম ক্রিয়েটিনিনসহ বিভিন্ন পরীক্ষা। রোগীদের দাবি, এসব পরীক্ষা একসঙ্গে করাতে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কয়েক হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক পরিবারকে ধার-দেনা করে কিংবা সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে পরীক্ষার টাকা জোগাড় করতে হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে ডা. মোঃ রাকিবুল হাসানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সামনাসামনি কথা বলবেন বলে জানান। ফোনে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে বিষয়টি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল। তাঁর দাবি, ডা. রাকিব হাসান কোনো মেডিকেল অফিসার নন এবং কার্ডিওলজি বিভাগের সঙ্গেও তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে তিনি কীভাবে নিয়মিত কার্ডিওলজি বিভাগের রোগী দেখছেনÑএটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল আরও বলেন, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। এর কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তেই নিশ্চিত হবে। এখন বড় প্রশ্নÑসরকারি হাসপাতালে মাত্র ১০ টাকার টিকিট কেটে চিকিৎসা নিতে আসা একজন রোগীর প্রেসক্রিপশনে কেন ওষুধের পরিবর্তে হাজার হাজার টাকার পরীক্ষা দেওয়া হচ্ছে? এসব পরীক্ষা কোথায় করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে? আর এর পেছনে কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে কি নাÑতা খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ সরকারি হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, এটি অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়। তাই বহির্বিভাগে যে চিকিৎসকরাই রোগী দেখুন না কেন, কোনো পরীক্ষা প্রয়োজন হলে রোগী ও স্বজনদের সম্ভব হলে সরকারি হাসপাতালেই পরীক্ষা করানোর বিষয়ে উৎসাহিত করা এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানানো অত্যন্ত জরুরি। রোগীদের পকেটের সামর্থ্য নয়, তাদের অসুস্থতা ও প্রয়োজন বিবেচনাই যেন চিকিৎসার প্রধান বিষয় হয়Ñএটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button