সংকটে সাতক্ষীরার বিচার বিভাগ

বিচারকহীন নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে মামলাজট
জজশিপে ১০ বিচারকের পদ শূন্য
শূন্য শতাধিক কর্মচারীর পদও
আইনমন্ত্রী’র হস্তক্ষেপ চান বিচারপ্রার্থীরা
বদিউজ্জামান, সাতক্ষীরা ঃ নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে ৫ হাজারের কাছাকাছি মামলা বিচারাধীন। কিন্তু বিচারক নেই প্রায় এক বছর ধরে। ফলে বিচারপ্রার্থী নারী ও শিশুদের অপেক্ষার যেন শেষ নেই। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা জজশিপের বিভিন্ন আদালতে শূন্য রয়েছে ১০টি বিচারকের পদ। রয়েছে শতাধিক কর্মচারীর ঘাটতি। নতুন নতুন আদালত সৃষ্টি হলেও পর্যাপ্ত এজলাস ও দাপ্তরিক কক্ষ নেই। লিগ্যাল এইড অফিসেও রয়েছে বিচারক, জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট। সব মিলিয়ে নানা সমস্যায় জর্জরিত সাতক্ষীরার বিচার বিভাগ। এমন পরিস্থিতিতে আজ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামানের সঙ্গে সাতক্ষীরার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হবে।
জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে সাতক্ষীরায় এটিই তাঁর প্রথম সফর। আর এই মতবিনিময়কে ঘিরে দীর্ঘদিনের এসব সংকটের দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা করছেন বিচারপ্রার্থী জনগণ, আইনজীবী ও সচেতন মহল।
প্রায় ৫ হাজার মামলা, বিচারক নেই নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে ঃ সাতক্ষীরায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলার বিচারের জন্য রয়েছে মাত্র একটি ট্রাইব্যুনাল। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এই আদালতে প্রায় এক বছর ধরে কোনো বিচারক নেই। অথচ সেখানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৫ হাজারের কাছাকাছি।
বিচারক না থাকায় মামলার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা নারী, শিশু ও তাদের পরিবারকে আদালতে এসে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সময় দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে বিচারপ্রার্থীদের অর্থনৈতিক ও মানসিক দুর্ভোগও বাড়ছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সাতক্ষীরার একমাত্র নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অবিলম্বে বিচারক নিয়োগ এখন জেলার অন্যতম প্রধান দাবি।
সদর সরকারি জজ আদালতেও একবছর ধরে নেই সিনিয়র সিভিল জজ ঃ
সাতক্ষীরা সদর সরকারি জজ আদালত জেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি আদালত। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে সেখানে কোনো সিনিয়র সিভিল জজ নেই। ফলে দেওয়ানি মামলার বিচারপ্রার্থী জনগণকেও নানা ধরনের হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিচারপ্রার্থীদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ আদালতে দীর্ঘদিন বিচারকের পদ শূন্য থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দ্রুত বিচারক পদায়নের মাধ্যমে আদালতটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। জজশিপে ১০ বিচারকের সংকট ঃ বর্তমানে সাতক্ষীরা জজশিপের বিভিন্ন আদালতে সর্বমোট ১০ জন বিচারকের ঘাটতি রয়েছে। এরমধ্যে নারী- শিশু একটি, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজের দুইটি এবং সিনিয়র সিভিল জজের একটি পদ প্রায় এক বছর ধরে শূন্য। ফলে বিদ্যমান বিচারকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করতে হচ্ছে। একজন বিচারককে একাধিক আদালতের দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ বাড়ছে। একদিকে মামলা বাড়ছে, অন্যদিকে বিচারকের সংখ্যা কমছেÑএ অবস্থায় দ্রুত শূন্য পদ পূরণ না হলে মামলাজট আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। শতাধিক কর্মচারী নেই, একজনেরঘাড়ে দুই-তিন আদালতের দায়িত্ব ঃ বিচারকের পাশাপাশি সাতক্ষীরা জজশিপে রয়েছে বড় ধরনের কর্মচারী সংকট। প্রায় শতাধিক কর্মচারীর ঘাটতি থাকায় একজন কর্মচারীকে কখনো তিন থেকে চারটি আদালতের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
ফলে স্বল্পসংখ্যক কর্মচারীর ওপর ডায়েরি-কজলিস্ট লেখা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজের চাপ বেড়েছে। নথিপত্র ব্যবস্থাপনা, দাপ্তরিক কাজ ও আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন আদালত সৃষ্টি, কিন্তু এজলাস নেই ঃ সাতক্ষীরা জজশিপে অবকাঠামোগত সংকটও এখন তীব্র। দুই তলা নির্মাণ উপযোগী একটি ভবনের ওপর তৃতীয় তলা নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে ভবনটির আর ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের সুযোগ নেই। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু নতুন আদালত সৃষ্টি হওয়ায় এজলাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। শুধু এজলাস নয়, বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় নথিপত্র সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাতেও জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিচার বিভাগের জন্য আধুনিক, নিরাপদ ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো নির্মাণ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। লিগ্যাল এইডেও সংকট, প্রয়োজন পৃথক ভবন মামলার জট কমাতে এবং স্বল্প সময়ে বিনা খরচে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে লিগ্যাল এইড কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য লিগ্যাল এইড অফিস হতে পারে ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। কিন্তু সাতক্ষীরায় লিগ্যাল এইড অফিসেও রয়েছে বিচারক, জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে লিগ্যাল এইড অফিসে আসা বিচারপ্রার্থীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
লিগ্যাল এইডকে প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব ও বিচারপ্রার্থীদের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দ্রুত এসব সংকট দূর করার পাশাপাশি সাতক্ষীরায় একটি পৃথক লিগ্যাল এইড ভবন নির্মাণের দাবি উঠেছে। সাতশোর কাছাকাছি আইনজীবীরও নেই পর্যাপ্ত কর্মপরিবেশ সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতিও অবকাঠামোগত সংকটে রয়েছে। প্রায় সাতশোর কাছাকাছি সদস্য থাকলেও আইনজীবীদের পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা ও উন্নত কর্মপরিবেশ নেই। সমিতির লাইব্রেরিতেও রয়েছে প্রয়োজনীয় আইনগ্রন্থের সংকট। আইনজীবীদের পেশাগত কাজের পরিবেশ উন্নত করতে নতুন ভবন নির্মাণ, পর্যাপ্ত চেম্বার ও বসার ব্যবস্থা এবং সমৃদ্ধ আইন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
ভূমি অপরাধ আইনের ৮ ধারার কার্যকর প্রয়োগ চান ভুক্তভোগীরা ঃ সাতক্ষীরায় ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ ও জবরদখল দীর্ঘদিনের সমস্যা। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ জনস্বার্থে প্রণীত হলেও আইনের ৮ ধারার বিধান অনুযায়ী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কার্যকর পদক্ষেপ এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা আইনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সাতক্ষীরার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যাতে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনÑএমন দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী জনগণ। সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরায় মাদক ট্রাইব্যুনাল চান জনগণ ঃ সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় সাতক্ষীরায় মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ একটি বড় সামাজিক সমস্যা। দেশের বিভিন্ন জেলায় মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলেও সাতক্ষীরায় এখনো এ ধরনের কোনো ট্রাইব্যুনাল নেই। মাদক সংক্রান্ত মামলার দ্রুত বিচার ও মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচারিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সাতক্ষীরায় দ্রুত মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানিয়েছেন জেলার সচেতন জনগণ।
সংকটের মধ্যেও পরিবর্তনের উদ্যোগ
এতসব সংকটের মধ্যেও সাতক্ষীরার বিচার বিভাগে ইতিবাচক পরিবর্তনের নানা উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বিচার বিভাগে দুর্নীতি বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি আদালত অঙ্গনে নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছেন।
বিচারপ্রার্থীদের বসার জন্য ‘ন্যায় কুঞ্জ’-এর পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে ‘ছায়াবিথী’। আদালত প্রাঙ্গণের পরিত্যক্ত স্থানকে কাজে লাগিয়ে নান্দনিক ‘শাপলা চত্বর’ নির্মাণের উদ্যোগও ইতোমধ্যে প্রশংসা পেয়েছে। এসব উদ্যোগ আদালতকে আরও বিচারপ্রার্থী-বান্ধব করে তোলার প্রচেষ্টারই প্রতিফলন। আইনমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের প্রত্যাশা ঃ বিচারক সংকট, কর্মচারী ঘাটতি, এজলাস ও অবকাঠামোগত সমস্যা, নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালের বিচারকহীনতা, লিগ্যাল এইডের সংকট, আইনজীবীদের কর্মপরিবেশ, ভূমি অপরাধ আইনের ৮ ধারার কার্যকর প্রয়োগ এবং মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠাÑসব মিলিয়ে সাতক্ষীরার বিচার বিভাগের সামনে রয়েছে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ।
জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামানের সাতক্ষীরায় প্রথম সফর এবং বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কে তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন জেলার বিচারপ্রার্থী মানুষ ও সচেতন মহল।
তাদের প্রত্যাশা, মতবিনিময়ে সাতক্ষীরা বিচার বিভাগের বাস্তব সংকটগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত বিচারক পদায়ন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশা একটাইÑবিচার যেন শুধু আদালতে থাকে না, সময়মতো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।



