খুলনাঞ্চলে এবার ২০০ কোটি টাকার ‘অফসিজন তরমুজ’ বিক্রির সম্ভাবনা!

# অঞ্চলে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমি, বেড়েছে ২৯১ হেক্টর
# সম্ভব্য উৎপাদনের টার্গেট ৫৪,৭৬৬ মেট্রিক টন, বিক্রির সম্ভবনা ২১৮ কোটি
# স্বল্প বিনিয়োগে অধিক লাভবান হওয়াই আগ্রহী হচ্ছেন কৃষক
মোঃ আশিকুর রহমান : তরমুজের সময় নয়, তবুও গাছে গাছে ঝুলছে তরমুজ! দখতে ছোটও নয়, প্রতিটির ওজন ৫-৮ কেজি। তরমুজের মৌসুম না হলেও অফসিজন বা অসময়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জনপ্রিয় ও লাভজনক একটি কৃষিতে পরিনত হয়েছে খুলনাঞ্চলের অফসিজন তরমুজ। আশির দশক থেকে খুলনাঞ্চলে ব্যাপকভাবে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারিত হয় এবং ওই চিংড়ি ঘেরগুলোর বেড়িবাঁধের পতিত পড়ে থাকত। বর্তমানে এ অঞ্চলের কৃষকেরা সারা বছর ব্যাপী নানামুখি চাষাবাদের পাশাপাশি সল্প বিনিয়োগে অধিক লাভের আশায় ওই সকল মাছের ঘের বা পতিত জমিতে মাচা করে অফসিজন তরমুজের চাষাবাদ অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বি হয়ে উঠছেন। যে কারণে দিনকে দিন এই অঞ্চলে এই অফসিজন তরমুজ চাষবাদে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অসময়ে এই তরমুজের চাষবাদ সম্প্রসারিত হলে এ অঞ্চলের কৃষির বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চল তথ্যসূত্রে, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে খুলনাঞ্চলের ৪ জেলায় অফসিজন তরমুজ চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ১৮২০ হেক্টর জমি, যা গত অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা হতে ৫৯১ হেক্টর বেশি। যার মধ্যে খুলনার লক্ষ্যমাত্রা ১৫৭৭ হেক্টর, বাগেরহাটে ৬৮ হেক্টর, সাতক্ষীরায় ১৫১ হেক্টর এবং নড়াইলে ২৪ হেক্টর। চাষাবাদের বিপরীতে অঞ্চলে সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ৫৪ হাজার ৭৬৬ মেট্রিক টন। যার মধ্যে খুলনায় ৪৬ হাজার ৫১৫ মেট্রিক টন, বাগেরহাটে ২ হাজার ১২০ মেট্রিক টন, সাতক্ষীরায় ৫ হাজার ১৮২ মেট্রিক টন এবং নড়াইলে ৭৩৪ মেট্রিক টন ধরা হয়েছে। অঞ্চলের সম্ভাব্য উৎপাদনের বিপরীতে বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে ২১৮ কোটি ২০ লাখ ১২ হাজার টাকা (বর্তমানে কৃষকদের জমিতে উৎপাদিত অফসিজন তরমুজ প্রতি কেজি ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, ওই অনুসারে সম্ভাব্য দাম ধরা হয়েছে)। যার মধ্যে খুলনায় ১৮৬ কোটি ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৮’শ টাকা, বাগেরহাটে ৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, সাতক্ষীরায় ২০ কোটি ৭২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও নড়াইলে ২ কোটি ৯৩ লাখ ৪৭ হাজার ২’শ টাকা।
এ বিষয়ে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়নের কেয়াখালি গ্রামের কৃষক ফারুক বিশ^াস জানান, ঘের পাড়ের ২ বিঘা জমিতে (৫০ শতকে বিঘা) অফসিজন তরমুজ চাষ করেছি। বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে ১৫/২০ হাজার টাকা এবং বিক্রি করেছি ৬০/৭০ হাজার টাকা। এ তরমুজ চাষা করে বেশ লাভবান হয়েছি। প্রকল্পের আওতায় নানামুখি সহয়তা করা হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত খোজখবর নেন।
এ বিষয়ে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়নের কালিকাপুর ব্লকের দায়িত্বরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা করুনা ম-ল জানান, চলতি বছরে আমার ব্লকে ১৫ হেক্টর জমিতে ৮০-৯০ জন কৃষক অফসিজন তরমুজ চাষাবাদ করছেন। বিঘা প্রতি কৃষকের উৎপাদন খরচ পড়ছে ১৫/২০ হাজার টাকা,বিপরীতে প্রতি বিঘায় উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করছেন ৭০/৮০ হাজার টাকা। কৃষকদের বীজ দিয়ে সহয়তা করা হয়েছে। সল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় চাষিরা বেশি আগ্রহী হচ্ছে এ চাষাবাদে।
খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার মো. নাজমুল হুদা জানান, এই উপজেলায় চলতি বছরে ৩১৫ হেক্টর জমিতে অফসিজন তরমুজ চাষাবাদ করছেন প্রায় ৫/৬ হাজার কৃষক। বিঘা প্রতি কৃষকের উৎপাদন খরচ পড়ছে ২০/২৫ হাজার টাকা, বিক্রি মানভেদে ৫৫-৮০ হাজার টাকায়। প্রায় ১১’শ জনের অধিক কৃষককে বীজ সার সহয়তা করা হয়েছে। সল্প খরচে কৃষকেরা অধিক লাভবান হওয়ায় এ অঞ্চলে চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি অফিস থেকে কৃষকের সার্বিক সহয়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে খুলনা বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আবু বকর সিদ্দিক জানান, এই উপজেলায় চলতি বছরে ৮২০ হেক্টর জমিতে অফসিজন তরমুজ চাষাবাদ করছেন প্রায় ৫ হাজার কৃষক। গত বছর থেকে এবছর ২’শ হেক্টর জমিতে বেশি এ চাষাবাদ করা হচ্ছে। প্রতিটি তরমুজ উৎপাদনে কৃষকের খরচ হচ্ছে ১০/১২ টাকা, বিক্রি করছে ৪০/৫০ টাকা দরে। বিঘা প্রতি কৃষকের উৎপাদন খরচ পড়ছে ২০/২৫ হাজার টাকা, বিক্রি করছে ১ লাখ ২০ হাজার হতে দেড় লাখে। সল্প খরচে কৃষকেরা অধিক লাভবান হওয়ায় এ অঞ্চলে চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি অফিস থেকে কৃষকের সার্বিক সহয়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলা কৃষি অফিসার মো. শওকত ওসমান জানান, এই উপজেলায় চলতি বছরে ৩৭ হেক্টর জমিতে অফসিজন তরমুজ চাষাবাদ করছেন প্রায় ৩ শতাধিক কৃষক। গত বছর থেকে এবছর ৫ হেক্টর জমিতে বেশি এ চাষাবাদ করা হচ্ছে। তরমুজ উৎপাদনে কৃষকের বিঘা প্রতি কত খরচ হচ্ছে, তা হিসাব করা হয়নি, তবে বিঘা প্রতি লাভ হচ্ছে ৫৫-৬০ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় কৃষকের বীজ প্রদান করা হয়েছে এবং প্রদার্শনী প্লটের জন্য বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে। কৃষি অফিস থেকে কৃষকের সার্বিক সহয়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার কৃষি অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, এই উপজেলায় চলতি বছরে ১৫ হেক্টর জমিতে অফসিজন তরমুজ চাষাবাদ করছেন কৃষকেরা। বিঘা প্রতি কৃষকের উৎপাদন খরচ পড়েছে ১২/১৫ হাজার টাকা এবং বিক্রি হয়েছে ৭০/৮০ হাজার টাকা। কৃষকের বীজ প্রদান করা হয়েছে এবং প্রদার্শনী প্লটের জন্য বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে। কৃষি অফিস থেকে কৃষকের সার্বিক সহয়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রাসরণ অধিদপ্তর খুলনা জেলার উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম জানান, চলতি বছরে খুলনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০১৫ হেক্টর, সেখানে অর্জিত হয়েছে ১৫৭৭ হেক্টর, হার ১৫৫%। সল্প খরচে অধিক লাভবান হওয়ার দরুন এ জেলার কৃষকেরা অফসিজন তরমুজ চাষে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এক সময় এ জেলার যেসকল মাছের ঘেরে কেবল মাছ চাষ করা হতো, সেখানে আজ মাচা করে অফসিজন তরমুজের চাষাবাদে কৃষকেরা অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বি হয়ে উঠছেন।
সার্বিক বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, খুলনাঞ্চলে চলতি অর্থবছরে ১৮২০ হেক্টর জমিতে অফসিজন তরমুজ চাষাবাদ করা হচ্ছে যা, গত বছর হতে প্রায় ৬’শ হেক্টর বেশি। উৎপাদন খরচ কম এবং লাভের পরিমান বেশি হওয়ায় কৃষকেরা এ চাষাবাদে বেশ আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষকের নিজের উৎপাদিত অফসিজন তরমুজ এ অঞ্চলের মানুষের পুষ্টিগুণের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজারজাতকরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আমি বিশ^াস করি।



