স্থানীয় সংবাদ

খুমেকে বিভাগীয় প্রধান নিয়োগ নিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি : কয়েক ঘণ্টা পর স্থগিত

স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা মেডিকেল কলেজের (খুমেক) মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক (চলতি দায়িত্ব) ডা. মো. জাহিরুল হককে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেওয়ার প্রতিবাদে কর্মবিরতিতে যাওয়া ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কয়েক ঘণ্টা পর কর্মবিরতি স্থগিত করেছেন। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টা থেকে কর্মবিরতি শুরু হয়ে রাত ৮টার দিকে তা স্থগিত করা হয়।
একই ঘটনায় মেডিসিন বিভাগের বর্তমান বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এ বি এম সাইফুল আলমের কক্ষে তালা লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। বিষয়টি স্বীকার করেছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. কামরান হোসেন।
কর্মবিরতি স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করে ডা. কামরান হোসেন বলেন, খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এবং খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম মনার সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। কেডিএ চেয়ারম্যান সরাসরি হাসপাতালে এসে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সমস্যা ও দাবিগুলো তাদের জানিয়েছি। এরপর যে অফিস আদেশটি হয়েছে, সেটি স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের কথা বিবেচনা করে কর্মবিরতি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়। খুলনার সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার কথা চিন্তা করে আমরা কর্মবিরতি স্থগিত করেছি।’ ডা. কামরান আরও বলেন, ‘আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল বিষয়টি মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। আমরা ইতোমধ্যে কর্মস্থলে যোগদান করেছি।’
এর আগে শনিবার দুপুর ১টা থেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেন। কর্মবিরতির কারণে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর মধ্যে খুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় খুমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে রোগীর চাপ রয়েছে। পাশাপাশি হামের রোগীর চাপও বেড়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
কয়েকজন রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, কর্মবিরতির কারণে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ওষুধ দেওয়া ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতে তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
খুমেক সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আমানুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ডা. মো. জাহিরুল হককে মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদেশে বলা হয়, বর্তমান বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এ বি এম সাইফুল আলম আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাবেন। তাঁর শেষ কর্মদিবসে মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক (চলতি দায়িত্ব) ডা. মো. জাহিরুল হক দায়িত্বভার গ্রহণ করে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ আদেশের প্রতিবাদে কর্মবিরতির ঘোষণা দেন ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের নেতারা।
ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. কামরান হোসেন বলেন, ‘ডা. জাহিরুল হকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) আজীবন সদস্য এবং জুলাইয়ের আন্দোলনের বিরোধিতাকারী ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো শিক্ষককে হেয় করতে চাই না। শিক্ষক হিসেবে তাঁর একাডেমিক কার্যক্রমে থাকার বিষয়ে আমাদের আপত্তি নেই। তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা কাউকে মেডিসিন বিভাগের প্রধান হিসেবে আমরা মেনে নেব না।’
এর আগে কর্মবিরতি চলাকালে ডা. কামরান হোসেন জানিয়েছিলেন, অফিস আদেশ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে। তবে জরুরি বিভাগ চালু রেখে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে।
বিভাগীয় প্রধানের কক্ষে তালা লাগানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষ থেকেই করা হয়েছে।’
তবে খুলনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আমানুল ইসলাম বলেন, জ্যেষ্ঠতার নীতিমালা অনুসরণ করেই ডা. জাহিরুল হককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘একজন পিআরএলে চলে যাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের জ্যেষ্ঠতা নীতিমালা অনুসরণ করেই বর্তমানে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. জাহিরুল হককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করে তারা কর্মবিরতি করছেন।’
অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘আমি তাদের অনুরোধ করেছি, এখন ইমার্জেন্সি চলছে। সারা দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে একটি অ্যালার্ট অবস্থা চলছে। এ অবস্থায় ছোটখাটো একটি ইস্যু নিয়ে কর্মবিরতিতে গেলে পরিস্থিতি বেহাল হয়ে দাঁড়াবে।’
তিনি জানান, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিষয়টি নিয়ে আরও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছেন। সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনের নামও তারা বলেছেন। তবে তাঁর প্রোফাইলও একই বলে মন্তব্য করেন অধ্যক্ষ। ডা. সৈয়দ আমানুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় ডা. জাহিরুল হক এখানে কর্মরত ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আমাকে ডকুমেন্ট দিতে হবে। কিন্তু তারা কোনো ডকুমেন্ট দিতে পারেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি দুইজনের প্রোফাইলে কোনো পার্থক্য দেখছি না। যিনি জ্যেষ্ঠ, তিনিই দায়িত্ব পাবেন। তবে তারা যেহেতু এসেছে, তাদের কথাও গুরুত্ব দেওয়া হবে। রোববার মিড-লেভেলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলব। এরপর সিনিয়র শিক্ষকদের সবার সঙ্গে কথা বলব। রিভিউ করার মতো কোনো বিষয় থাকলে রিভিউ করা হবে।’ তবে আমি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব দিয়েছি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছি।’
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘খুমেক হাসপাতালের পরিচালক ছুটিতে আছেন। এ কারণে বিষয়টি মীমাংসার জন্য রোববার খুলনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে আমরা বসব। দ্রুত সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে ডেঙ্গু ও হামের রোগীর চাপ বেড়েছে। এখন যদি ইন্টার্ন চিকিৎসকরা লাগাতার কর্মবিরতি করেন, তাহলে রোগীদের ভোগান্তি বাড়বে।’
তবে রাত ৮টার দিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি স্থগিত করে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ায় আপাতত চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button