স্থানীয় সংবাদ

বটিয়াঘাটায় গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যু: ১০ দিনেও রহস্যের জট খোলেনি, আলামত নষ্টের আশঙ্কা

বটিয়াঘাটা (খুলনা) প্রতিনিধি : খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা সদর ইউনিয়নের শিলিন্দামারী এলাকায় গোবিন্দ বাড়ৈ (৫৫) মৃত্যুর ঘটনায় প্রায় ১০ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ফলে গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যু স্বাভাবিক, দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকা-Ñএ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার দিকে শিলিন্দামারী এলাকার একটি পুকুরঘাট থেকে গোবিন্দ বাড়ৈকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয় বলে জানা যায়। পরে তাকে বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরপর পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
তবে মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে শুরু থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের বক্তব্যে মরদেহে আঘাতের চিহ্ন, মাথায় কোপের দাগ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে সন্দেহজনক আলামতের কথা উঠে এসেছে। এসব তথ্যের সত্যতা অবশ্য ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আলামত সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাস্থল ও গোবিন্দ বাড়ৈর বাড়িকে ঘিরেও উঠেছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মরদেহ উদ্ধারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বাড়ির বিভিন্ন গাছ কেটে ফেলা এবং রান্নাঘরের ঝুপড়ি/ঘর ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়। এর পেছনে মৃতের সৎকারের খরচ বা পারিবারিক প্রয়োজনের কথা বলা হলেও তদন্তের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব স্থাপনা ও বস্তু ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, তা আগে পরীক্ষা করা হয়েছে কি নাÑসে প্রশ্নও উঠেছে।
কোনো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বস্তু বা আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তদন্তের স্বার্থে তা সংরক্ষণ ও জব্দ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে অপরাধের আলামত গোপন বা নষ্ট করে অপরাধীকে আইনি শাস্তি থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কাজ করার বিষয়টিও দ-নীয় হিসেবে উল্লেখ আছে।
সন্দেহের তালিকায় কয়েকজন, তবে প্রমাণের অপেক্ষা
মৃত গোবিন্দ বাড়ৈর একমাত্র মেয়ে পূর্বাকে ঘিরেও স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা চলছে। তার সঙ্গে কতিপয় কয়েকজন ব্যক্তির যোগাযোগ ও ঘটনার সময়কার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তবে এসব ব্যক্তির কাউকেই হত্যার সঙ্গে জড়িত বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা সন্দেহের বিষয়গুলো তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সময় কে কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে কার মোবাইলে যোগাযোগ হয়েছিল, ঘটনাস্থলে কারা গিয়েছিলেন এবং মরদেহ উদ্ধারের আগে-পরে কী ঘটেছিলÑএসব বিষয় মোবাইল ফোনের কললিস্ট, লোকেশন ডাটা, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
৩০ মিনিটে পাইকগাছা থেকে বটিয়াঘাটায় আশাকে কেন্দ্র করে উঠছে প্রশ্ন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সন্দেহভাজন একজন ব্যক্তির মোবাইল লোকেশন পাইকগাছা এলাকায় পাওয়া তথ্য রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে তাকে বটিয়াঘাটা এলাকায় দেখা গেছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে শুধু মোবাইল টাওয়ারের লোকেশন দিয়ে কারও উপস্থিতি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায় কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। ওই ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণে মোবাইলের কল ডিটেইল রেকর্ড (ঈউজ), সেল-সাইট ডাটা, সংশ্লিষ্ট সময়ের কল ও মেসেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জমি বিক্রির তথ্যও তদন্তের আওতায় আসছে
স্থানীয়ভাবে আরও দাবি করা হচ্ছে, গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর প্রায় দুই দিন আগে জৈই নিকো এক ব্যক্তির নামে/সম্পর্কিত জমি বিক্রির একটি তথ্য পাওয়া গেছে। জমি বিক্রির সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, কিংবা এটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়Ñতা দলিল, রেজিস্ট্রি রেকর্ড, লেনদেনের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করলেই স্পষ্ট হতে পারে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্টই গুরুত্বপূর্ণ
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল। মরদেহে আঘাতের চিহ্ন থাকলে তার ধরন, মৃত্যুর কারণ, মৃত্যুর আনুমানিক সময় এবং কোনো যৌন বা শারীরিক নির্যাতনের আলামত ছিল কি নাÑএসব বিষয়ে ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রক্ত, বীর্য, চুল, উঘঅ, আঙুলের ছাপসহ বিভিন্ন শারীরিক উপাদান কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না এবং ভুক্তভোগী বা সম্ভাব্য অপরাধীর সঙ্গে ঘটনার যোগসূত্র আছে কি নাÑতা নির্ধারণে ফরেনসিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন
গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছেÑ
১. পুকুরঘাটে গোবিন্দ বাড়ৈ কীভাবে অসুস্থ বা আহত অবস্থায় পড়লেন?
২. তাকে উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন?
৩. মরদেহে থাকা আঘাতের চিহ্ন কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে?
৪. ঘটনাস্থল ও বাড়িতে থাকা সম্ভাব্য আলামত সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না?
৫. বাড়ির গাছ ও রান্নাঘরের অংশ ভাঙা/কাটা হলো কেন এবং কখন?
৬. সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ঘটনার সময়কার মোবাইল লোকেশন কী ছিল?
৭. তাদের সঙ্গে গোবিন্দ বাড়ৈ বা তার পরিবারের সদস্যদের কী ধরনের যোগাযোগ ছিল?
৮. জমি বিক্রির ঘটনাটি মৃত্যুর সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না?
৯. ময়নাতদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী পাওয়া গেছে?
১০. ফরেনসিক পরীক্ষায় কোনো উঘঅ, রক্ত বা অন্য আলামত পাওয়া গেছে কি না?
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় নানা আলোচনা ও সন্দেহ তৈরি হলেও ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং তদন্তে প্রাপ্ত প্রমাণ ছাড়া কাউকে হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। একই সঙ্গে কোনো সম্ভাব্য আলামত নষ্ট বা পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা দ্রুত সংরক্ষণ করা তদন্তের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ঘটনাস্থল, মরদেহ উদ্ধারের স্থান, সংশ্লিষ্ট বাড়ি, মোবাইল যোগাযোগ, জমি বিক্রির নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ফরেনসিক রিপোর্টÑসবকিছু সমন্বিতভাবে যাচাই করা হলে গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসতে পারে।
গোবিন্দ বাড়ৈর মৃত্যুÑস্বাভাবিক মৃত্যু, দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকা-? উত্তর এখন ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা ও তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।এ ব্যাপারে বটিয়াঘাটা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ মারুফ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে উনি বলেন ঘটনা টি হত্যা কি আত্মহত্যা ময়নাতদন্ত ছাড়া তা নিশ্চিত বলা সম্ভব না

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button