যশোরে হৃদরোগের চিকিৎসায় সংকট : ৯ মাসে ১৮ হাজার রোগী

# রেফার ১০ হাজার #
যশোর ব্যুরো ঃ গত ২৯ সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্ব হার্ট দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘একটি হৃদস্পন্দন যেন মিস না হয়’। অথচ যশোরে হৃদরোগীদের জন্য প্রতিটি মূল্যবান মুহূর্তই যেন অনিশ্চয়তায় ভরা। জেলার প্রধান সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেই পূর্ণাঙ্গ করোনারি চিকিৎসাসেবা, নেই হৃদরোগীদের জন্য কার্ডিয়াক অ্যাম্বুলেন্স। ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা কিংবা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক রোগীর মৃত্যু হচ্ছে বলে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ১৮ হাজার ৩৬ জন রোগী সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। মাত্র ২৮ শয্যার এ ইউনিটে প্রতিদিন গড়ে ৭০ জনের মতো রোগী ভর্তি থাকছেন। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় রোগীদের মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এদিকে সিসিইউতে জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সীমিত থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ নির্ভর ব্যবস্থাপনাতেই আটকে থাকছে চিকিৎসাসেবা। হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইনোক্সাপারিন সোডিয়াম ইনজেকশন সরকারিভাবে সরবরাহ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক রোগীর স্বজনকে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি ইনজেকশনের জন্য প্রায় ৫৫০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। যশোর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আহসান কবির বাপ্পি বলেন, ২৮ শয্যার বিপরীতে রোগী থাকেন প্রায় দ্বিগুণ। তাই সব রোগীকে সরকারি ইনজেকশন দেওয়া সম্ভব হয় না। কেবল দরিদ্র রোগীদের এটি দেওয়া হচ্ছে। তবে সিসিইউ পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৩৩টি পদের অনুমোদন দিয়েছে। আশা করছি, আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। চিকিৎসকনেতা অধ্যাপক ডা. ফারুক এহতেশাম পরাগ ও বিএমএ নেতা ডা. রবিউল ইসলাম তুহিন বলেন, দীর্ঘ দুই দশকেও যশোরে পূর্ণাঙ্গ করোনারি চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। এতে যশোরসহ আশপাশের জেলার হৃদরোগীরা জরুরি সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগীদের খুলনা বা ঢাকায় স্থানান্তরের সময় কার্ডিয়াক অ্যাম্বুলেন্স ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি বেড়ে যায়। হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মাশফিকুর রহমান বলেন, হৃদরোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণ হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এত বছরেও সিসিইউ পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি। চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু শয্যা বাড়িয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। জরুরি হৃদরোগীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ করোনারি কেয়ার ব্যবস্থা, ক্যাথল্যাব, অভিজ্ঞ ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, কার্ডিয়াক সার্জন ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন। পাশাপাশি সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজন কার্ডিয়াক অ্যাম্বুলেন্স ও পর্যাপ্ত লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা। তাদের মতে, এসব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে যশোরসহ আশপাশের ছয় জেলার হৃদরোগীদের উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়বে। কমবে জরুরি মুহূর্তে রোগী নিয়ে খুলনা বা ঢাকায় ছুটে যাওয়ার ঝুঁকি ও ভোগান্তিও।



