কয়রার ২০ বিদ্যালয়ে নেই মুসলিম শিক্ষক অমুসলিমরাই পড়াচ্ছেন ইসলাম শিক্ষা

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি ঃ সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার ২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো মুসলিম শিক্ষক নেই। এসব বিদ্যালয়ে মুসলিম শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়টি পড়াচ্ছেন অমুসলিম শিক্ষকরা। আরবি ভাষা, সূরা ও কেরাত সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে শুধু বইয়ের বাংলা অর্থ পড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করতে হচ্ছে। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।
সুন্দরবন সংলগ্ন বাবুরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০৮ জন। তাদের সবাই মুসলিম। বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। তবে পাঁচজনই সনাতন ধর্মাবলম্বী। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টিতে কোনো মুসলিম শিক্ষক না থাকায় ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়টিও অমুসলিম শিক্ষকদেরই পড়াতে হচ্ছে। একই অবস্থা গড়িয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ১৪৩ জন। এর মধ্যে ৮৭ জন মুসলিম। শিক্ষক রয়েছেন ছয়জন, কিন্তু তাদের কেউই মুসলিম নন। ফলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে নানা সীমাবদ্ধতা। দক্ষিণ বেদকাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি আরও পুরোনো। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১৯ বছর ধরে বিদ্যালয়টিতে কোনো মুসলিম শিক্ষক নেই। শুধু এই তিনটি বিদ্যালয় নয়, উপজেলার মোট ২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই চিত্র।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, যেসব বিদ্যালয়ে কোনো মুসলিম শিক্ষক নেই সেগুলো হলো হাতিয়ারডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাঁশখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়, হড্ডা ডিএম প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর মহেশ্বরীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, হড্ডা প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাবুরাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়, হরিয়ারপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, বানিয়াখালি সুন্দরবন প্রাথমিক বিদ্যালয়, তালবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ ভাগবা প্রাথমিক বিদ্যালয়, আংটিহারা প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ বেদকাশী প্রাথমিক বিদ্যালয়, গাংরকি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম হড্ডা প্রাথমিক বিদ্যালয়, গড়িয়াবাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাউলিয়াঘাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঠাকুরের চর প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ হাতিয়ারডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ হড্ডা পল্লী উন্নয়ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাতিয়ারডাঙ্গা পূর্বচক প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এসব বিদ্যালয়ের বেশিরভাগে চার থেকে ছয়জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও একজন মুসলিম শিক্ষকও নেই। ফলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা পড়ানোর দায়িত্ব অমুসলিম শিক্ষকদের ওপরই পড়ছে।
এ সকল বিদ্যালয়ের অভিভাবকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই পরিস্থিতি চলায় অনেকই তাদের সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উপস্থিতিতেও প্রভাব পড়ছে। গড়িয়াবাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক মোঃ সাহেব আলী সানা বলেন, শিক্ষকরা সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় তাদের পক্ষে আরবি সূরা ও কেরাত শুদ্ধভাবে শেখানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে কোমলমতি শিশুদের বুনিয়াদি ধর্মীয় শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। গড়িয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিজন বিহারী বর্মন বলেন, ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে নতুন শিক্ষকরা এখানে পোস্টিং পেলেও দ্রুত বদলি হয়ে চলে যান। তবে আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। আশা করি দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে। কয়রা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তপন কুমার কর্মকার জানান, সরকারি শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালায় হিন্দু বা মুসলিম আলাদা করে পদায়নের নিয়ম নেই, যার ফলে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। অধিক গুরুত্ব দিয়ে বিধি মোতাবেক এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।



