আজ বিশ্ব কন্যা শিশু দিবস দারিদ্র্যকে হারিয়ে স্কুলমুখে কয়রার কন্যা শিশুরা

# ওরা এখন কাজের মেয়ে’ নয়
কয়রার শিশুরা এখন স্কুলে যায় #
রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি ঃ গ্রামে যাচ্ছ একজন কাজের মেয়ে নিয়ে এসো। ছোটখাটো একটা মেয়ে হলেও চলবে। শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার আগে এমন আবদার শুনতে হয়েছে অনেককেই। এক সময় দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শহরের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানোর প্রবণতা ছিল উপকূলীয় জনপদ কয়রার কিছু এলাকায়। অভাবের তাড়নায় অনেক বাবা-মা সন্তানদের হাতে বই-খাতা তুলে দেওয়ার বদলে পাঠাতেন অন্যের বাড়িতে কাজ করতে। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের চিন্তা ভাবনাও। খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন সকাল হলেই দেখা যায় ভিন্ন এক দৃশ্য। দল বেঁধে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাচ্ছে শিশুরা। কারও গায়ে স্কুলের পোশাক, কারও কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। ছোট ছোট চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন। কেউ হতে চায় শিক্ষক কেউ চিকিৎসক, কেউবা সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ। সংসারে অভাব আছে, আছে নিত্যদিনের টানাপোড়েন। তবু সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক বাবা-মা নিজের কষ্ট আড়াল করে তাদের পাঠাচ্ছেন বিদ্যালয়ে। তাঁদের কাছে এখন সন্তানদের শ্রম নয়, শিক্ষাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। কয়রা উপজেলার কয়েকটি প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রাম্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিশুদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয়গুলো। শিক্ষক-শিক্ষিকারা ব্যস্ত সময় পার করেন শিশুদের পাঠদানে। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি উপবৃত্তি, বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, বিদ্যালয়ে খাবারের ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুদের বিদ্যালয় মুখী করতে ভূমিকা রাখছে। আগে পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্য অনেক শিশুকে কাজে পাঠানো হলেও এখন সেই প্রবণতা কমেছে বলে তাঁদের অভিমত। কলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম নুরুল আমিন নাহিন বলেন, এখান সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীরা মাসে ১শ ৫০ টাকা আর প্রাক প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা ৭৫ টাকা উপবৃত্ত পায়। এছাড়া প্রতিদিন প্রটিন বিস্কুট পায়। ৬ নম্বর কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভবেশ চন্দ্র ম-ল বলেন, গ্রামের মানুষও এখন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পারছেন। নিজেরা হয়তো লেখাপড়ার সুযোগ পাননি, কিন্তু সন্তানদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে চান। সরকার বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দিচ্ছে। অভিভাবকেরাও তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। তাই গ্রামে গেলেই কাজের লোক পাওয়া যাবে এমন ধারণা এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। ৪ নম্বর কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শেফালী খাতুন বলেন, দারিদ্র্েযর কারণে একসময় অনেক অভিভাবক ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার পরিবর্তে কাজে পাঠাতেন। এখন তাঁরা বুঝতে পারছেন, শিক্ষা ছাড়া সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা কঠিন। অভাবের মধ্যেও তাঁরা সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করছেন। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবে উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম চালু রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে শিশুদের খাবারের ব্যবস্থাও তাদের উপস্থিতি বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে। তবে এসব সুবিধার পরিমাণ ও কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা দপ্তরের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হাওলাদারের জীবনে অভাবের গল্প দীর্ঘদিনের। সংসারে অনেক সন্তান। একসময় আর্থিক সংকট সামলাতে তাঁর কয়েকজন মেয়েকে শহরে কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরে পড়ে। আমজাদ হাওলাদার বলেন, অনেক ছেলে-মেয়ে হওয়ায় প্রথম দিকে কয়েকজন মেয়েকে শহরে কাজের জন্য পাঠিয়েছিলাম। তারা লেখাপড়া শিখতে পারেনি। এখন আর সেই ভুল করতে চাই না। বাকি ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। সংসার চালাতে আমার অনেক কষ্ট হয়। তারপরও চাই, ওরা লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হোক। আমি যে কষ্ট করেছি, ওরা যেন সেই কষ্টের মুখোমুখি না হয়।” তাঁর এই কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে উপকূলের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের স্বপ্নÑনিজেরা যে সুযোগ পাননি, সন্তানদের সেই সুযোগটুকু করে দেওয়া। দিনমজুর পরেশ ম-লের জীবনেও অভাব নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিনের শ্রমে চলে সংসার। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা তাঁর সন্তানদের স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে দিতে চান না তিনি। কয়রা উপজেলা শিক্ষা অফিসার তপন কুমার কর্মকার বলেন, সকল ছেলে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে। যে কারনে বিগত দিনের তুলনায় অনেক ছাত্র ছাত্রীরা এখন লেখা পড়া করছে। তা ছাড়া শিক্ষকদের ভাল ব্যবহারে শিশুরা বাড়ি থাকতে চায় না। কয়রার মানুষের দাবি প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন যে শিশুরা বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, তাদের সবার জীবন হয়তো এক রকম নয়। কারও ঘরে খাবারের সংকট, কারও বাবার দিনমজুরির আয়েই চলে সংসার, আবার কারও মাকে নিজের চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিতে হয় সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তারপরও তারা স্কুলে যাচ্ছে। কারণ তাদের বাবা-মা বুঝতে শিখেছেন, দারিদ্র্য হয়তো সাময়িকভাবে জীবনকে আটকে রাখতে পারে, কিন্তু শিক্ষা পারে নতুন পথ খুলে দিতে।



