সুন্দরবন সংলগ্ন ১৫ রিসোর্টের উদ্যোক্তাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

স্টাফ রিপোর্টার : সুন্দরবন সংলগ্ন অনুমোদনহীন রিসোর্ট বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত নোটিশের খবরের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে খোলা চিঠি দিয়েছেন সুন্দরবনের প্রান্তিক পর্যটন উদ্যোক্তারা। পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করে টেকসই ইকো-ট্যুরিজম পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা, সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বয় এবং বিদ্যমান বিনিয়োগের স্বচ্ছ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে সুন্দরবনসংলগ্ন রিসোর্টগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিষয়টি নিশ্চিত করেন ‘রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন’-এর সেক্রেটারি ও ‘জংগলবাড়ি ম্যানগ্রোভ রিসোর্ট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া হোসাইন শাওন। তিনি বলেন, গত ৪ অক্টোবর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে রিসোর্ট বন্ধের চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানতে পেরেছেন তাঁরা। তবে তাঁরা নিজেরা ওই চিঠি পাননি বলে তার দাবি। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে দেওয়া খোলা চিঠিতে উদ্যোক্তারা জানান, সুন্দরবনের কোলঘেঁষে ইকো-ট্যুরিজমের সঙ্গে যুক্ত একদল তরুণ উদ্যোক্তা নিজেদের সঞ্চয়, ব্যাংকঋণ ও পরিবারের সহায়তায় বিভিন্ন রিসোর্ট ও পর্যটনসেবা গড়ে তুলেছেন। তাঁদের লক্ষ্য, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি অঞ্চলটিকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা। চিঠিতে তাঁরা বলেন, তাঁদের উদ্যোগ শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কর্মসংস্থান এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প জীবিকা তৈরির সম্ভাবনা জড়িয়ে রয়েছে। উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের পেরিফেরি এলাকায় প্রায় ১৭ কিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা ১৫টি রিসোর্টে বর্তমানে ১৫৩ জন কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে ১৩৫ জনই স্থানীয় বাসিন্দা। এ ছাড়া পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় দোকান, বোট সার্ভিস, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ এবং হাঁস-মুরগির খামারসহ ৫৮টি ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও ব্যবসা গড়ে উঠেছে।
তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, বানিশান্তা ও কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের প্রায় ৭ হাজার ৩০০ মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। পর্যটন তাঁদের কাছে শুধু পর্যটকের আগমন নয়, বরং পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় মেটানো এবং সুন্দরবনের ওপর চাপ কমিয়ে বিকল্প জীবিকা গড়ে তোলার সুযোগ।
খোলা চিঠিতে উদ্যোক্তারা আরও বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব এবং সুস্পষ্ট নির্দেশনার সীমাবদ্ধতা তাঁদের দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে। একদিকে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জÑএই দুইয়ের মধ্যে তাঁরা বাস্তবসম্মত সমাধান চান।
তাঁদের ভাষ্য, সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করতে চান না তাঁরা। আইন মেনে, পরিবেশগত শর্ত পূরণ করে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পর্যটন পরিচালনা করতে আগ্রহী উদ্যোক্তারা। এ জন্য বিশেষ সুবিধার পরিবর্তে সুস্পষ্ট নীতিমালা, স্বচ্ছ অনুমোদন প্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যকর সমন্বয় দাবি করেছেন তাঁরা।
জাকারিয়া হোসাইন শাওনের স্বাক্ষরিত চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীকে সুন্দরবনসংলগ্ন রিসোর্টগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলা হয়, তাঁর সফরের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ঘিরে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশ এবং বিকল্প জীবিকার সম্ভাবনা সরাসরি দেখার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও আন্তদপ্তরীয় সমন্বয়হীনতার কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলোও তিনি সরাসরি জানতে পারবেন।
চিঠিতে সুন্দরবনসংলগ্ন পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় টেকসই ইকো-ট্যুরিজমের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়ন, কার্যকর ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু, সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত এবং বিদ্যমান বিনিয়োগগুলোর আইনসম্মত ও স্বচ্ছ পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। উদ্যোক্তারা বলেন, প্রশাসনিক জটিলতায় সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলো বন্ধ হয়ে যাক, তা তাঁরা চান না। একইভাবে উন্নয়নের নামে সুন্দরবনের পরিবেশের ক্ষতিও তাঁদের কাম্য নয়। প্রকৃতি সুরক্ষিত রেখে স্থানীয় মানুষের সম্মানজনক জীবিকা এবং উদ্যোক্তাদের নিয়ম মেনে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা চান তাঁরা। এদিকে, দেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ১৮টি রিসোর্ট বন্ধের চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। গত ৪ অক্টোবর দেওয়া ওই নোটিশে যেসব রিসোর্টের নাম রয়েছে, সেগুলো হলোÑসুন্দরী, ইরাবতী, অরণ্যছায়া, অরণ্যবাড়ী, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় টেকসই পর্যটন বিকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।



