নগরীতে ভোরের আলো ফোঁটার আগেই গুলির শব্দ, সন্ধ্যা নামতেই হত্যাকা-!

মাদক ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব
সন্ত্রাসীদের দাপট ও অস্ত্রের ঝনঝনানিতে আতঙ্ক
কামরুল হোসেন মনি : ভোরের আলো ফোটার আগেই গুলির শব্দ, সন্ধ্যা নামতেই হত্যাকা-। কখনো গুলি করে হত্যা, কখনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম, আবার কখনো বাড়িতে ঢুকে গুলিবর্ষণ। ছিনতাইয়ের মতো অপরাধেও ব্যবহার হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র।
অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন বিভিন্ন বিরোধে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। হামলা থেকে রেহাই পাননি পুলিশ কর্মকর্তাও। একের পর এক এসব ঘটনার এ চিত্র এখন খুলনার নিত্যসঙ্গি। এতে করে বাড়ছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
চলতি বছরের অক্টোবরজুড়ে খুলনা মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় একাধিক হত্যাকা-, গুলিবর্ষণ ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবর এক দিনেই মহানগরীতে পৃথক ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান দুইজন। ভোরে গুলিতে নিহত হন যুবক তুষার (২৭), সন্ধ্যায় গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন গৃহবধূ খুশি বেগম (২৫)।
এর আগে রূপসায় ছেলে জয় ঢালী হত্যার দেড় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে গুলিতে নিহত হন তাঁর বাবা আক্তার ঢালী (৬০)। দিঘলিয়ায় গুলিতে প্রাণ হারান পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নাসিমুল গনি ওরফে নাসিম।
গত ২২ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নগরীর মিস্ত্রিপাড়া বাজারসংলগ্ন আনসার উদ্দিন লেনে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তুষারের মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব বানিয়াখামারের খাদিমুল উলুম মাদ্রাসার সামনে কয়েকজন যুবকের মধ্যে ধস্তাধস্তির পর গুলির ঘটনা ঘটে। একই দিন সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে লবণচরা থানার জিন্নাপাড়া বউ বাজারের সাত নম্বর গলিতে খুশিকে গুলি ও কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকা- ঘটে থাকতে পারে।
গত ৫ অক্টোবর রূপসার দূর্জনীমহল এলাকায় গুলিতে নিহত হন আক্তার ঢালী। এর আগে ১৫ আগস্ট একই এলাকায় তাঁর ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। গত ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ার ফরমাইজখানায় গুলিতে নিহত হন নাসিমুল গনি ওরফে নাসিম। এ ছাড়া ৭ অক্টোবর দৌলতপুরের বিএল কলেজের দ্বিতীয় গেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মহিদুল ইসলাম (২২)। ১০ অক্টোবর কাশিমনগরে গুলিবিদ্ধ হন গ্যাস কোম্পানির অপারেটর আশিকুজ্জামান জনি (৩৪)। ১৯ অক্টোবর চাঁনমারি অ্যাপ্রস রোডের খ্রিষ্টান পাড়ায় একটি বাড়িতে ঢুকে চার থেকে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ে হেলমেট পরা দুর্বৃত্তরা। এতে কেউ হতাহত না হলেও এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নগরীর পশ্চিম টুটপাড়া আমতলা মোড়ে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন শেখ জুম্মান রহমান বিশাল (২৭)।
অন্যদিকে, ৮ অক্টোবর দিবাগত রাতে কলেজিয়েট স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীদের চাপাতির আঘাতে গুরুতর আহত হন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম (৪৩)। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ১৭ অক্টোবর শেরে বাংলা নগরের বকুলতলা বাজার এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত সাহেলকে লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তথ্য বলছে, নগরীর অপরাধজগতে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখল, আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও অস্ত্রের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে এসব গ্রুপের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। সেই বিরোধের জেরে সংঘর্ষ ও হত্যাকা-ের ঘটনাও ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় নগরীর আলোচিত অপরাধী গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বি-কোম্পানি’, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, বেজি আল-আমিন ও শাকিল গ্রুপ।
কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীর আট থানায় ২০২৪ সালে ২৯টি, ২০২৫ সালে ৩৭টি এবং চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৩০টি হত্যাকা- ঘটেছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৩ মাসে হত্যাকা-ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৬টি।
কেএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) গোলাম মোহাম্মদ জানিয়েছেন, এসব ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, “সন্ত্রাসী যেই হোক না কেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।” তাঁর দাবি, বেশির ভাগ হত্যাকা-ের পেছনে মাদককে কেন্দ্র করে বিরোধের বিষয়টি সামনে আসছে। একের পর এক হত্যাকা- ও সশস্ত্র হামলায় নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, অপরাধী চক্রের তৎপরতা দমন এবং হত্যাকা-ের তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।



