বাড়ির পাশের নদীতে শুরু : আজ দেশের সেরা সাঁতারু জুঁই

রেজাউল করিম রেজা, কুষ্টিয়া থেকে ঃ বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে চলা সাগরখালী নদী। এক সময় নদীটিতে স্রোত থাকলেও এখন মরা প্রায়। এ নদীতেই মায়ের কাছ থেকে সাঁতার শেখা শুরু জুঁইয়ের। অবসর সময়ে শিশুরা যেখানে খেলনা নিয়ে খেলা করতো, সেই সময় পাড়ার সমবয়সীদের ছেড়ে সাঁতার শিখতেন জুঁই। শুরুতে মায়ের কাছে হলেও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় সাঁতারে প্রশিক্ষণ নিতে ক্লাবে ভর্তি হন তিনি। বাবা একজন বর্গা চাষি। অভাব অনটনের মধ্যে মেয়েকে লেখাপড়ার পাশাপাশি সাঁতার শেখানোর আগ্রহ ছিল জুঁইয়ের মায়ের। সকালে সাঁতার প্রশিক্ষণ, তারপর বাড়িতে এসে স্কুল আবার বিকেলে সাঁতার প্রশিক্ষণ, এভাবেই ছোটবেলা কাটে জুঁইয়ের। জুঁই এখন উচ্চমাধ্যমিকে পড়ছেন। সেই সঙ্গে দেশ সেরা সাঁতারু। সম্প্রতি বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনায় “ম্যাক্স গ্রুপ ৩৫তম জাতীয় সাঁতার, ড্রাইভিং ও ওয়াটারপোলো প্রতিযোগিতা-২০২৬” এ এককভাবে সাঁতারে ১০টি স্বর্ণপদক এবং দুটি রৌপ্য পদক অর্জন করে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন সাগরখালী নদীর কুলের মেয়ে জুঁই আক্তার। জুঁই আক্তার কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামের নদীর কুল (সাগরখালী নদী) পাড়ার সাইফুল ইসলাম ও বিলকিস খাতুনের মেয়ে। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট জুঁই। জানা যায়, গত ২৮ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চারদিনব্যাপী বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনায় “ম্যাক্স গ্রুপ ৩৫তম জাতীয় সাঁতার, ড্রাইভিং ও ওয়াটারপোলো প্রতিযোগিতা-২০২৬” অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার মিরপুর সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্সে। এ প্রতিযোগিতায় বিভাগীয় ও জেলা ক্রীড়া সংস্থা, সুইমিং ক্লাব, বিকেএসপি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০০ জন খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী দল ৩৪টি স্বর্ণ, ২৪টি রৌপ্য ও ১৫টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৭৩টি পদক লাভ করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দল ১৬টি স্বর্ণ, ২২টি রৌপ্য এবং ২৬টি ব্রোঞ্জসহ মোট ৬৪টি পদক লাভ করে দ্বিতীয় স্থান, বিকেএসপি দুটি রৌপ্য এবং ছয়টি ব্রোঞ্জসহ মোট আটটি পদক অর্জনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থান অধিকার করে। এর মধ্যে কুষ্টিয়ার মিরপুরের মেয়ে জুঁই আক্তার সাঁতার ক্যাটাগরিতে ১০টি স্বর্ণ ও দুটি রৌপ্যসহ মোট ১২টি পদক জিতে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হয়ে অংশ নিয়ে এ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন জুঁই। মেয়ে হিসেবে সাঁতার শেখাকে এলাকার মানুষ খারাপ চোখে দেখলেও এখন তারাই জুঁইয়ের প্রশংসা করছেন। জুঁই এখন সাঁতারুদের কাছে অনুপ্রেরণা বলে জানান তার প্রশিক্ষকরা। সাঁতারু জুঁই আক্তার জানান, সাঁতার শেখার শুরুটা হলো আমার পরিবারের কাছে। আমার বাড়ির কাছে যে নদী, এখানে মায়ের কাছ থেকে প্রথম সাঁতার শেখা। তারপর চতুর্থ শ্রেণিতে যখন পড়ি, তখন পাশের আমলা ইউনিয়নের ‘সাগরখালী সুইমিং ক্লাবে’ ভর্তি হই। আশেপাশের কয়েকজন সাঁতার শিখতে যেতো, তাদের সঙ্গে ওখানে সাঁতার শিখতে যেতাম। ওখানে কিছুদিন সাঁতার শেখার পরে আমার কোচ আমিরুল ইসলাম স্যার আমাকে বলেন, তুমি বিকেএসপিতে ভর্তি হও। ওখানে গেলে তুমি ভালো প্রশিক্ষণের পাশাপাশি লেখাপড়া ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারবে। জুঁই বলেন, সাঁতার শেখা নিয়ে এলাকার অনেকেই অনেক কথা বলতো। কিন্তু আমার পরিবার আমাকে সব সময় সাপোর্ট দিয়ে এসেছে। বর্তমান সম্পর্কে জুঁই বলেন, আমি বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিক্তিক সাঁতারু হিসাবে রয়েছি। তিনমাস আগে এখানে যোগদান করেছি। এর আগে আমি বিকেএসপিতে ছিলাম। সর্বশেষ ৩৫তম জাতীয় প্রতিযোগিতায় সাঁতারে আমি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অংশ নিয়ে ১০টি স্বর্ণপদক এবং দুটি রৌপ্য পদক অর্জন করেছি। আমাদের আমলা ইউনিয়ন থেকে অনেক ভালো ভালো সাঁতারু তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েও তারা সফলতা বয়ে এনেছে। রুবেল রানা, সফুরা, অনিক আমার অনুপ্রেরণা। ভালো সাঁতার শেখার মতো ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ সময় আমরা পুকুর, জিকে ক্যানেল এ সাঁতার শিখতাম, যোগ করেন জুঁই। জুঁই তার স্বপ্ন সম্পর্কে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাফ গেমসে বাংলাদেশের বড় সফলতা নেই। ২০১৬ সালের পর থেকে কোনো স্বর্ণপদক পায়নি। তাই আমার এখন স্বপ্ন এবং সবোর্চ্চ চেষ্টা হলো সাফ গেমসে বাংলাদেশের হয়ে ভালো রেজাল্ট করা। যাতে করে দেশের সম্মান বৃদ্ধি পায়। জুঁইয়ের মা বিলকিস খাতুন বলেন, আমার মেয়ের জন্য আমার এখন গর্ব হয়। প্রথম যখন সাঁতার শিখতে যায়, তখন আমি সঙ্গে নিয়ে যেতাম। এখন আমি কতটা খুশি তা বলে বোঝাতে পারবো না। আমি চাই সে আরও ভালো করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করুক। তিনি আরও বলেন, যারা এক সময় কটু কথা বলতো, তারা এখন প্রশংসা করছে। তবে আমি চাই যারা গ্রামে এখনো সাঁতার শেখে, তাদের জন্য ভালো সাঁতার শেখার ব্যবস্থা করা হোক। জুঁই আক্তারের বাবা সাইফুল ইসলাম বলেন, মেয়ে ভালো কিছু করলে বাবার যে কতটা আনন্দ হয়, তা কাউকে বোঝানো যাবে না। আমি চাই আমার মেয়ে আরও ভালো কিছু করে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করুক। সাগরখালী সুইমিং ক্লাবের প্রশিক্ষক মর্জিনা খাতুন জানান, জুঁই প্রথম আমার এবং আমার ভাই আমিরুলের কাছ থেকে সাঁতার শিখতে শুরু করে। শুরুতেই তার সাঁতার দেখে আমি ভাইকে বলেছিলাম, এ মেয়েটা অনেক ভালো কিছু করবে। সে এখন সাঁতারুদের কাছে অনুপ্রেরণা। তিনি বলেন, আমলা (ইউনিয়ন) থেকে অনেক সাঁতারু তৈরি হয়েছে। তবে এখানে ড্রেসিং রুম ও ওয়াশরুমের অভাবে সাঁতারুদের অনেক কষ্ট করতে হয়। বিগত দিনের তুলনায় সাঁতার প্রশিক্ষণে ছেলে-মেয়েরা কম আগ্রহী, আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাচ্ছি এবং সাঁতারে আগ্রহী করার চেষ্টা করছি। সেই সঙ্গে এবার জুঁই যে সাফল্য এনেছে, এতে করে নতুন করে সাঁতারে আগ্রহী হবে অনেকেই, যোগ করেন তিনি। বাংলাদেশ সুঁইমিং ফেডারেশনের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়ার সাঁতার অঙ্গণের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রশিক্ষক আমিরুল ইসলাম বলেন, জুঁই একদম গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন ভালো সাঁতারু। তাকে আরও ভালো প্রশিক্ষণ দিলে আর্ন্তজাতিক অঙ্গণে দেশের হয়ে ভালো কিছু করবে সে। কুষ্টিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব মেজবাহ উদ্দিন পিন্টু বলেন, কুষ্টিয়ার আমলা ইউনিয়ন সাঁতারের দুর্গ এবং সাঁতারু তৈরির ঊর্বর ভূমি। এখানকার সংগঠকরা আন্তরিকতার সঙ্গে সাঁতারকে লালন-পালন করে যোগ্য সাঁতারু তৈরির চেষ্টা করছেন, যা দেশের জন্য কল্যাণকর। ভবিষ্যতে কুষ্টিয়াকে কেন্দ্র করে সাঁতারের উন্নয়নে আরও পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। কুষ্টিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ বলেন, জুঁই অত্যন্ত চৌকস ও পরিশ্রমী সাঁতারু। জাতীয় পর্যায়ে একাধিক ইভেন্টে এমন ধারাবাহিক সাফল্য কুষ্টিয়ার সাঁতারের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অর্জন। তার সাফল্য দেশের সাঁতার অঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করবে। জুঁইয়ের সফলতায় তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন কুষ্টিয়া-২, ৩ ও ৪ সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, কুষ্টিয়ার সাঁতারুদের উন্নয়নে অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সুযোগ সুবিধা দিতে পারলে আরও ভালো হবে। সেই সঙ্গে মাদক থেকে ছেলে-মেয়েদের বের করে আনতে ক্রীড়ার কোনো বিকল্প নেই। যেহেতেু কুষ্টিয়া থেকে ভালো সাঁতারু তৈরি হয়, তাই কীভাবে এ সাঁতারকে আরও সমৃদ্ধ করা যায় সেজন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জুঁইয়ের এ অর্জনে আনন্দ ও গর্ব ছড়িয়ে পড়েছে তার নিজ এলাকায়। দলে দলে তার বাড়িতে ভীড় করছেন মানুষ। এছাড়া বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন, রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও তাকে শুভেচ্ছা জানানো হচ্ছে। তবে শুধু জুঁই নয়, কুষ্টিয়া থেকে প্রতিবছরই সেরা সেরা সাঁতারুরা উঠে আসেন। একটু ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে আরও ভালো সাঁতারু উঠে আসবে এ কুষ্টিয়া থেকে- এমনটিই প্রত্যাশা করেন সচেতন নাগরিকরা।



