সীমান্তে এক দিনে ৫ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ : ২ দিনে নিহত ২

কক্সবাজার-বান্দরবন সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো থেকে লোকজন সরিয়ে ক্যাম্পে নিচ্ছে বিজিবি
মর্টার শেলের ভগ্নাবশেষ, গুলি কুড়িয়ে বিজিবির কাছে জমা দিচ্ছে সাধারণ মানুষ, মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী পুলিশ বিজিপি ২৬৪ সদস্য অস্ত্রসহ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে
জান্তা সেনাবাহিনীর বিপুল পরিমান অস্ত্র আরাকান আর্মির দখলে
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ মিয়ানমার থেকে আসা গুলিতে মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) পাঁচ বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। এর আগেরদিন নিহত হয়েছেন দু’জন। এছাড়াও গতকাল যারা আহত হয়েছেন তারা কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী ও থাইংখালী এলাকায় চারজন এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কক্সবাজারের আহতরা হলেন- পালংখালী ইউনিয়নের নলবনিয়া এলাকার আয়ুবুল ইসলাম, রহমতেরবিল এলাকার আনোয়ার হোসেন, পুটিবনিয়া এলাকার মোবারক হোসেন ও মো. কালা। এছাড়া ৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টারশেলের আঘাতে হোসনে আরা (৪৫) নামে এক বাংলাদেশি নারী এবং নবী হোসেন নামে এক রোহিঙ্গা (৬৫) নিহত হয়েছেন। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চারজন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন ও মোবারকের অবস্থা গুরুতর। এখনো গুলিবর্ষণের শব্দ শুনা যাচ্ছে। এদিকে মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তে মিয়ানমার থেকে আসা গুলিতে সৈয়দ আলম (৩৫) নামের এক বাংলাদেশি আহত হন। গোলাগুলির কারণে নিজ বাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি প্রথমে গাছে লাগার পর সৈয়দ আলমের কপালের পাশ দিয়ে চলে যায়। এতে গুরুতর আহত হলে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ দিকে আরাকান আর্মির আক্রমণের মুখে এ পর্যন্ত বিজিপি ও অন্যান্য বাহিনীর ২৬৪ জন বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হেফাজতে রয়েছেন।
এর আগে গতকাল সোমবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের জলপাইতলী গ্রামের একটি রান্নাঘরে মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টারশেলের আঘাতে দুইজন নিহত হয়েছেন। নিহত দুইজনের মধ্যে একজন বাংলাদেশি নারী, অন্যজন রোহিঙ্গা পুরুষ। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহিন ইমরান জানান, মিয়ানমারে সংঘাত বেড়েছে। মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি, মর্টারশেল এসে পড়ছে সীমান্তের এপারে। সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্তের মানুষকে নিরাপদে আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। অপরদিকে আরাকান আর্মিদের হাতে হতাহত হওয়ায়র মিয়ানমারের বিজিপি সেনা-পুলিশসহ ২৬৪ জন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা তাদের যুদ্ধাস্ত্র বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বিজিবি’র কাছে জমা দিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘর্ষের জেরে এখন পর্যন্ত মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি), সেনা ও পুলিশসহ ২৬৪ জন বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নতুন করে আরও ৩৫ জন যোগ হয়ে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে। ২৬৪ জনের মধ্যে বিজিপির সদস্য আছেন ১৮৩ জন। বাকি ৪৬ জনের মধ্যে আছেন দুই সেনা সদস্য, চার সিআইডি, পাঁচ পুলিশ, স্পেশাল ব্রাঞ্চের ৯ জন, ইমিগ্রেশন সদস্য ২০ জন ও চারজন বেসামরিক নাগরিক। নতুন আশ্রয় নেওয়া ৩৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন নবনিযুক্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, গতকাল (গত সোমবার) রাত পর্যন্ত ১১৫ জন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি সদস্য, সেনা সদস্য আত্মসমর্পণ বা আমাদের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন। আজ (গতকাল মঙ্গলবার) সকালে আরও ১১৪ জন যোগ হয়েছেন। মোট ২২৯ জন আশ্রয় নিয়েছেন। পরবর্তীতে দুপুরের মধ্যে আরও ৩৫ জন যোগ হয়ে ২৬৪ জনকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, যারা অস্ত্রসহ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, তাদের অস্ত্র জমা নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হয়েছে। এদিকে, বিজিবির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ১৮৩ বিজিপি সদস্যের মধ্যে তুমব্রু বিওপির ৭৬ জন, ঘুমধুমের ৩৭ জন ও বালুখালী এলাকার ৭০ জন। এ নিয়ে মোট ২২৭ জন বিজিপি সদস্য কক্সবাজার বিজিবি ব্যাটেলিয়নের অধীনে আছেন। অন্যদিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং বিওপিতে আরও দুই বিজিপি সদস্য রয়েছেন। বিজিবি জানায়, সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত টহল ও চেকপোস্ট বৃদ্ধি করা হয়েছে। কোনো রোহিঙ্গাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। দেশের স্বার্থে সীমান্তে সার্বক্ষণিক নজরদারি বৃদ্ধি করেছে বিজিবি। এর আগে, গত সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিজিপির ১০৬ জন্য এবং রাত পর্যন্ত ১১৫ জন মিয়ানমার বিজিপি সদস্য পালিয়ে আসার তথ্য জানায় বিজিবি। এদিকে মিয়ানমারের সীমান্ত থেকে আসা মর্টার শেলের আঘাতে বান্দরবানে দুইজন নিহত হন। গত সোমবার দুপুরে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউপির চার নম্বর ওয়ার্ডের জলপাইতলি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন ওই এলাকার বাদশা মিয়ার স্ত্রী হাসিনা বেগম (৫২)। এ ছাড়া অপর নিহত রোহিঙ্গা পুরুষের (৫৫) পরিচয় জানা যায়নি। গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করা মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালিয়ে আসছে আরাকান আর্মিসহ কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী। সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় জান্তার অনুগত সেনাদের পরাজয়ের খবর আসছে। এমনকি অনেক জায়গায় সেনাবাহিনীর ঘাঁটি ও নিয়ন্ত্রিত এলাকাও দখলে নিতে শুরু করেছেন বিদ্রোহীরা। এ নিয়ে তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে ০৪ ফেব্রুয়ারি সকালে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রথম দফায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন বিজিপির ১৪ জন সদস্য। এরপর দফায় দফায় ওই সীমান্ত দিয়ে ঢুকতে থাকেন বিজিপির সদস্যরা। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে তীব্র সংঘর্ষের মধ্যে সেখানে চাকমা সম্প্রদায়ের প্রায় চারশ জন এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু লোক জড়ো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান। এ অবস্থায় ওই চাকমা-রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা করা হচ্ছে। অবশ্য সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ০৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে বলেছেন, মিয়ানমার সীমান্তের পরিস্থিতি খুবই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে সীমান্তে সশস্ত্র বাহিনীকে ধৈর্য ধরতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ম্রোউক ইউ এবং কাওয়াকতাউ টাউনশিপে দেশটির জান্তা বাহিনীর আরও দুটি আঞ্চলিক সদর দপ্তরের দখলের দাবি করেছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সশস্ত্র যোদ্ধারা। আরাকান আর্মির পক্ষে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক ম্রোউক ইউ-তে বেশ কয়েকদিনের সহিংস সংঘাতের পর স্থানীয় সময় সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন (এলআইবি)-৩৭৮ সদর দপ্তরের দখল নেন তাদের যোদ্ধারা। এর আগের মঙ্গলবার, আরাকান আর্মি কাছের এলআইবি ৫৪০ সদর দপ্তর দখল করে এবং টাউনশিপে এলআইবি ৩৭৭ ঘাঁটিতে হামলা চালায়। আরাকান আর্মি আরও দাবি করে, সশস্ত্র বাহিনীর এই তিনটি ব্যাটালিয়ন ম্রোউক ইউ রাজ্যের ঐতিহাসিক রাজধানী ম্রোউক ইউ প্রতœতাত্ত্বিক যাদুঘর, শহরের আবাসিক এলাকা এবং আশপাশের গ্রামগুলোতে নির্বাচারে গোলাবর্ষণ করে। এর জেরে বিদ্রোহীদের সশস্ত্র হামলার মুখে ঘাঁটি থেকে পালিয়েছে সেনারা।



