ভ্যানচালকের কাছে এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র, সমালোচনা

প্রবাহ রিপোর্ট : সদ্য সমাপ্ত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার বেশকিছু উত্তরপত্র খোলা ভ্যানে অরক্ষিতভাবে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও প্রকাশ হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আসলাম আলী একজন ভ্যানচালকের কাছে অরক্ষিত অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষার বেশকিছু উত্তরপত্র তার বিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারের বাসায় পাঠাচ্ছিলেন। বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ উত্তরপত্র এভাবে বহন করায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ওই ভিডিওতে ভ্যানচালকের সঙ্গে প্রধান শিক্ষক কিংবা বিদ্যালয়ের অন্য কোনও শিক্ষককে দেখা যায়নি। গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষার উত্তরপত্র খোলা ভ্যানে এইভাবে নিয়ে যাওয়া নিয়ে সমালোচনা করেছেন বিদ্যালয়ের অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টরা। এক মিনিট ৫৯ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ভ্যানচালক অরক্ষিতভাবে খোলা অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষার চার বান্ডিল খাতা এবং একটি বস্তার মধ্যে বেশ কিছু খাতা নিয়ে যাচ্ছেন পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারিক রোকসানা পারভীন পলি বাসায়। সে সময় এক ব্যক্তি ভ্যানচালককে জিজ্ঞেস করেন, খাতা কোথা থেকে নিয়ে আসলেন? ভ্যানচালক বলেন, হেড স্যারের (আসলাম আলী) বাসা থেকে নিয়ে আসলাম। আরেক ম্যাডামের কাছে দিয়ে আসার জন্য। সেই ম্যাডাম কে? জিজ্ঞেস করলে উত্তরে ভ্যানচালক বলেন, পলি ম্যাডাম (রোকসানা পারভীন পলি)। কে তিনি? জিজ্ঞেস করলে ভ্যানচালক বলেন, তিনি স্কুলের টিচার। ভিডিও করা ওই ব্যক্তি ভ্যানচালককে জিজ্ঞেস করেন, তিনি শিক্ষক না লাইব্রেরিয়ান? উত্তরে ভ্যানচালক বলেন, লাইব্রেরিয়ান। এই খাতা হেড স্যারের বাড়ি থেকে নিয়ে আসছেন কিনা জানতে চাইলে ভ্যানচালক বলেন, প্রধান শিক্ষক আমার কাছে দিয়ে (খাতা) বললেন, পলির বাসায় যেতে। কয় বান্ডিল খাতা আছে জানতে চাইলে ভ্যানচালক বলেন, ওইগুলায় যা আছে, সঠিক বলতে পারছি না। এখানে চার বান্ডিল আর বস্তার ভেতর মনে হয় ছয় বান্ডিল হবে। সব মিলিয়ে ১০ বান্ডিল হতে পারে। এ বিষয়ে জানতে পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারিক রোকসানা পারভিন পলিকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসলাম আলী ভ্যানচালককে দিয়ে খাতা পাঠানোর অভিযোগটি অস্বীকার করে বলেন, খাতা আমার বাসায় নিয়ে যাচ্ছিল স্কুলের আলমারি থেকে আমার স্টাফ। তবে স্টাফের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনি আসেন, আপনি আমার স্কুলে আসেন। প্রধান শিক্ষক এ প্রতিবেদককে একাধিকবার তার স্কুলে আসার প্রস্তাব দেন। এ বিষয়ে ভ্যানচালক মারজুল বলেন, দুই-তিন দিন আগে দুপুরের দিকে প্রধান শিক্ষক আমাকে তার বাড়ি থেকে পলি ম্যাডামের বাড়ি খাতা দিয়ে আসতে বলেন। এ সময় আমার সঙ্গে কেউ ছিল না। আমি নিজেই পলি ম্যডামের বাড়ি পরীক্ষার খাতা দিয়ে এসেছি। বিষয়টি খুবই গুরুতর অন্যায় হয়েছে উল্লেখ করে পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য হ্যাপি বলেন, এ ঘটনার পর স্কুলে থাকার যোগ্যতা প্রধান শিক্ষকের নেই। একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেই দায়িত্বে এত অবহেলা করা হলে তার কাছে কী আশা করা যেতে পারে। এ বিষয়ে মিরপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, আমি আর অল্প কিছুদিনের মধ্যে চাকরি থেকে অবসরে যাবো। তাই এ বিষয়ে এখন কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’ তবে তিনি উল্লেখ করেন, শুধু লিখিত না, অলিখিত উত্তরপত্রও এভাবে কেউ নিয়ে যেতে পারেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল ইসলাম বাপ্পি বলেন, বিষয়টি আমি কীভাবে জানবো? এটা আপনি আমাকে বলেন? একজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, খাতা বা উত্তরপত্র তাকে (শিক্ষক) দেওয়া হয় বোর্ড থেকে। এই উত্তরপত্র তিনি কোথায় নেবেন, কাকে দেখাবেন, এ নিয়ে আমার মনে হয় একটু বোর্ডে কথা বলেন। আমি ব্যবস্থা নিতে পারবো না। ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই, বোর্ডই নেবে। কারণ এখানে সংশ্লিষ্ট ডিরেক্টলি বলেন, ইনডিরেক্টলি বলেন, সবই বোর্ড। এ বিষয়ে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিন বলেন, এটা তিনি (প্রধান শিক্ষক) খুবই অন্যায় করেছেন। তিনি ঠিক করেননি। কোনোভাবেই ঠিক করেননি। কারণ একজন ভ্যানওয়ালার কাছে উত্তরপত্র দিয়ে দেবেন, তিনি সঙ্গেও থাকবেন না বা কেউ থাকবে না, এটা হতে পারে না। এসব ব্যাপারে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে আমার কোনও দ্বিধা নেই। তিনি আরও বলেন, আমি কোনও জোড়া-তালি দিয়ে কাজ করা মানুষ নই এবং জোড়াতালি দিয়ে কাজ করা আমি পছন্দ করি না। বা কোনও কিছু ঢাকতে হবে এরকম চিন্তাভাবনা আমি কখনও করি না। আমার কাছে অথনেটিক তথ্য দিলে আমি ব্যবস্থা নেবো। তবে গত সোমবার বিকালে শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এই প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তায় জানিয়েছেন, ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে প্রশ্ন করা হলে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি জানাননি।



