জাতীয় সংবাদ

সংকটে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা

দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে ঝুঁকি বেশি

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সংকট এখন আর কোনো সম্ভাব্য আশঙ্কা নয়, বরং চলমান বাস্তবতা। দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রায় এক কোটি পঞ্চান্ন লাখ মানুষ খাদ্যসংকটে রয়েছে, যা বিশ্লেষিত জনসংখ্যার প্রায় ষোলো শতাংশ। একই সময়ে প্রায় ষোলো লাখ শিশু চরম অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলের জনগোষ্ঠী এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কক্সবাজারে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রায় ত্রিশ শতাংশ এবং রোহিঙ্গাদের প্রায় চল্লিশ শতাংশ খাদ্যসংকটে রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিবিরে প্রায় তিন লাখ ষাট হাজার মানুষ জরুরি খাদ্যসংকটে পড়েছে, যা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট (এফপিএমইউ) এবং জাতিসংঘের তিন সংস্থা- খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি- যৌথভাবে প্রকাশিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন’ (আইপিসি) প্রতিবেদনে এই সংকটের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেশের ছত্রিশ জেলার নয় কোটি ছেষট্টি লাখের বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও মে থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তা আবার বেড়ে গেছে। বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বান্দরবান, রাঙামাটি, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ এবং কক্সবাজারে খাদ্যসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
অপরদিকে নোয়াখালী, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট কিছুটা উন্নতি করে ধাপ-২ অর্থাৎ চাপের অবস্থায় নেমে এসেছে। তবে বাগেরহাট, যা আগে ধাপ-২-এ ছিল, এখন ধাপ-৩ অর্থাৎ খাদ্যসংকটে যুক্ত হয়েছে। এই সংকটের পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ। অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতি মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ- বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা- কৃষি উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। খাদ্যবৈচিত্র্যের অভাব পুষ্টির ঘাটতি বাড়িয়েছে। তহবিল ঘাটতি ও দুর্বল স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যনিরাপত্তা এখন আর শুধু একটি উন্নয়ন ইস্যু নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। তারা মনে করেন, খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও মৎস্য ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। একইসাথে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে। একইসাথে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে।
তারা বলেন, এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী চরম খাদ্যসংকটে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা এখন আর শুধু একটি উন্নয়ন ইস্যু নয়, এটি একটি জরুরি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। আইপিসি এর মতো বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত বিশ্লেষণ কাঠামো ব্যবহার করে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে আরও সমন্বিত, দ্রুত এবং স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এই সংকট মোকাবেলায় খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি জোরদার, পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহে বৈচিত্র্য আনা, দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য পরিকল্পনা গ্রহণ, এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও মৎস্য ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। একইসাথে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো- কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে। খাদ্য, পুষ্টি ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, উন্নয়ন সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। কারণ, একটি ক্ষুধার্ত জনগোষ্ঠী শুধু মানবিক দুর্যোগ নয়, বরং জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button