জ্বালানি তেলের সংকট ক্রমশ রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই এর উত্তাপ এসে লেগেছে বাংলাদেশের তেলের বাজারে। ফলে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর দুই মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই এক চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে প্রশাসন। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি আর সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতায় দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের হাহাকার তৈরি হয়েছে, যা এখন কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন, ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অসাধু চক্রকে দমনে দৃঢ়তা দেখাতে না পারলে এই সংকট সরকারের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামাতে পারে। আগামী পাঁচ বছরের স্থিতিশীল শাসনের পথ প্রশস্ত করতে হলে এই মুহূর্তে জ্বালানি খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গত কয়েকদিন রাজধানীর কল্যাণপুর, গাবতলী, তেজগাঁও এবং শাহবাগের পাম্পগুলো ঘুরে দেখা গেছে, শত শত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে মাত্র কয়েক লিটার তেলের জন্য। তেলের এই অভাব কেবল যাতায়াতে নয়, মানুষের সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। সরবরাহ কম থাকায় গ্রাহক ও বিক্রেতাদের মধ্যে বাকবিত-া এখন নিত্যদিনের ঘটনা।
তেলের অভাবে বিশৃঙ্খলা ও মারামারিতে এরই মধ্যে দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার বাইরে থেকে পণ্য পরিবহনেও সংকটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রাইড শেয়ারিং অ্যাপের চালকরা জানাচ্ছেন, আগে পাম্পে গিয়ে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যেত, এখন খুঁজতে হয় কোন পাম্পে তেল দিচ্ছে। আগে তাদের ৮ ঘণ্টা কাজ করে যা আয় হতো, এখন ১৫ ঘণ্টাতেও এর অর্ধেক আয় হয় না বলে জানা তারা। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত ক্রয়ের কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষ এটিকে সরবরাহ ব্যবস্থার বড় ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছে। তেলের এই অঘোষিত সংকট জনজীবনে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে যা সামাজিক অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে। এদিকে গত ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের জানান, দেশে বিদ্যুতের বড় কোনো ঘাটতি নেই, তবে জ্বালানি সংকটের কারণে মাঝে মাঝে বিভ্রাট হতে পারে যা সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পরবর্তীতে সিরাজগঞ্জে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “কালোবাজারিরা তেলের মজুত তৈরি করে সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আমি সারাদেশে জেলা প্রশাসক, এসপিদের সাথে কথা বলেছি। তারা মনিটর করছে। তবে হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে দুর্নীতি আছে, ব্ল্যাক মার্কেটিং হচ্ছে। সিরাজগঞ্জে ইতোমধ্যে দুটি চক্র ধরা পড়েছে।” মন্ত্রী আরও জানান যে, সরকার ঢাকা মহানগরীর মোটরসাইকেল চালকদের জন্য কিউআর কোড সিস্টেম চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যাতে কেউ এক পাম্প থেকে বারবার তেল সংগ্রহ করতে না পারে। সরকার বর্তমানে প্রতিদিন ১৬০ কোটি টাকা জ্বালানি ভর্তুকি দিচ্ছে জানিয়ে তিনি জনগণকে সাশ্রয়ী হওয়ার এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না কেনার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে সরবরাহ লাইন ঠিক থাকলেও অস্বাভাবিক ডিমান্ড বা চাহিদা মেটানো সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর হলেও পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন, যা বর্তমান সংকটকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের মতে, দেশে ব্যবহৃত পেট্রোল ও অকটেনের প্রায় ৭০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে কনডেনসেট থেকে উৎপাদন করা হয়। সিলেটের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া উপজাত হাইড্রোকার্বন প্রক্রিয়াজাত করে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল) এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট থেকে ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পেট্রোল উৎপাদিত হয়েছে, যা আমদানির ওপর নির্ভরতা প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। তা সত্ত্বেও কেন পাম্পগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের জন্য কিলোমিটার জুড়ে লাইন লাগছে, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজেলের অভাব থাকলেও পেট্রোল-অকটেনের এই হাহাকার সম্পূর্ণভাবেই কৃত্রিম এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারকে শুরুতেই বেকায়দায় ফেলতে কোনো একটি প্রভাবশালী মহল বা সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে তেলের সরবরাহ আটকে দিচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ, আবাসিক ভবন বা গোয়ালঘর থেকে হাজার হাজার লিটার তেল উদ্ধার হওয়া কেবল মুনাফার জন্য নয়, বরং সরকারকে অস্থিতিশীল করার একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রও হতে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম মনে করেন, অতীতে জ্বালানি মজুত নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়ার কারণে জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যা প্যানিক বায়িংকে উসকে দিচ্ছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বর্তমান সংকটকে বহুমাত্রিক বলে অভিহিত করেছেন এবং সরকারের তদারকির অভাবকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, সরকারের উচিত তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাতে গুজব না ছড়ায়। তেলের অবৈধ মজুত ও পাচার ঠেকাতে ৯টি জেলায় বিজিবি মোতায়েন এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্তকে বিশেষজ্ঞরা স্বাগত জানালেও এর কঠোর প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে অসাধু সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধ সরকারও পাচ্ছে। আইনমন্ত্রী যে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তার নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং সিন্ডিকেট দমনে সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতার ওপরই নির্ভর করবে তাদের জনপ্রিয়তার ভবিষ্যৎ। ৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া সাশ্রয় নীতি যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকা-কে ব্যাহত করে, তবে তা জনমনে অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কিউআর কোড ভিত্তিক সুষম বণ্টন ব্যবস্থার দ্রুত বাস্তবায়নই এখন জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রধান উপায় হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, কারণ যাই হোক না কেন, সাধারণ মানুষ দিনশেষে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং স্থিতিশীল বাজার প্রত্যাশা করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকারকে তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে এবং আগামী ৫ বছর সফলভাবে দেশ পরিচালনা করতে হলে এই সংকটকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের আগামী দিনগুলোর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে তারা জনগণের দেওয়া এই গুরুদায়িত্ব পালনে কতটা সফল হবে। তেলের এই সংকট সমাধান করতে না পারলে তা কেবল অর্থনীতির নয়, বরং নতুন সরকারের স্থিতিশীলতার ওপরও বড় ধরণের ছায়া ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল ধারণা করছেন।



