জাতীয় সংবাদ

‘ফুরকান লিখেছিল সবাইকে মেরে ফেলবে’

# গাজীপুরে ৫ হত্যা #

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ গাজীপুরের কাপাসিয়ায় আলোচিত ৫ হত্যাকা-ের ঘটনায় একটি কক্ষ থেকে অভিযুক্ত স্বামী ফুরকান মিয়ার কম্পিউটারে টাইপ করা দুটি অভিযোগপত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। মরদেহগুলোর পাশেই সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। অভিযোগে নিহত স্ত্রী শারমিন বেগমের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং পরকীয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও একটি চিরকুট ও মাদকের বোতল উদ্ধার করা হয়। শনিবার (৯ মে) সকালে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউতকোনা গ্রামে প্রবাসী মনির হোসেনের আবাসিক কলোনি থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে শুক্রবার রাতের কোনো এক সময় এই হত্যাকা- ঘটানো হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া। পুলিশ প্রাথমিকভাবে তাকেই হত্যাকা-ের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখছে। নিহতরা হলেনÑ ফোরকানের স্ত্রী শারমিন বেগম (৩০), বড় মেয়ে মীম (১৫), মেজো মেয়ে মারিয়া (৮), ছোট ছেলে ফরিদ (২) এবং শারমিনের ছোট ভাই রসুল মিয়া (২২)। তারা গোপালগঞ্জ জেলা শহর থেকে জীবিকার তাগিদে কাপাসিয়া এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, ফুরকান মিয়ার ভাড়া করা ছোট দুটি কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রক্তের দাগ। খাটের ওপর কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখা ছিল শ্যালক রসুল মিয়ার মরদেহ। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। অন্য কক্ষে পাশাপাশি পড়ে ছিল তিন শিশুর গলাকাটা মরদেহ। আর নির্মমভাবে জানালার গ্রিলের সাথে হাত পা বেঁধে হত্যা করা হয়েছে স্ত্রী শারমিন বেগমকে। স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনের মতো সকালে সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বেলা হলেও ওই পরিবারটির কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিলেন না। পরে প্রতিবেশীরা গিয়ে ঘরের একটি জানালা দিয়ে উঁকি মারতেই আঁতকে ওঠেন। এরই মধ্যে নিহতের পরিবারের লোকজন এসেও হাজির হন সেখানে। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ এসে মরদেহ হেফাজতে নেয়। স্থানীয় প্রতিবেশী রেহানা বেগম জানান, ফোরকান ও শারমিনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ঝগড়া ও বিরোধ চলছিল। মাঝে মধ্যে তাদের ঘর থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শোনা যেত। কিন্তু হঠাৎ করে এমন একটি ভয়ংকর কাজ হবে এটা আমরা ভাবিনি। এখন শুনছি তার বউ নাকি পরকীয়া করে। কিন্তু নিষ্পাপ বাচ্চারা কী করেছে। তাদের কি অপরাধ, তাদের লাশ দেখে পুরো গ্রামের মানুষ কাঁদছেন। প্রতিবেশী সাইদুল ঢাকা পোস্টকে বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাক-বিতর্ক ছিল। মাঝে মধ্যে অনেক চিৎকার চেঁচামেচি হতো। এর ভেতরে আরও কোনো ঘটনা ছিল কিনা সেটা জানতাম না। এদিকে নিহত শারমিনের চাচি ইভা রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যৌতুকের জন্য শারমিনকে নির্যাতন করতেন ফোরকান। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার পারিবারিক সালিসও হয়েছে। ঘটনার পর ফোরকান নিজেই আত্মীয়দের ফোন করে হত্যার কথা জানিয়েছে। পরে আমরা গিয়ে পাঁচজনের মরদেহ দেখতে পাই। ইভা রহমানের দাবি, এই হত্যাকা-ের পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়েছিল। শ্যালক রসুলকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাড়িতে ডেকে এনে তাকেও হত্যা করা হয়। নিহত শারমিনের বাবা শাহাদাত হোসেন বলেন, ফুরকান আমার দুই সন্তান ও তিন নাতনিকে হত্যা করে পালিয়েছে। আমার মেয়েকে মাঝে মধ্যেই যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতো। সে একটা কাগজে লিখেছিল সবাইকে মেরে ফেলবে। আমরা কখনো বিশ্বাস করি নাই সে এমন ফুটফুটে বাচ্চাদেরসহ সবাইকে মেরে ফেলবে। অপরদিকে ফুরকান মিয়ার লিখা একটি অভিযোগপত্রে দেখা যায়, তার স্ত্রী শারমিন পরকীয়ায় আসক্ত, এছাড়াও শারমিন তার বাবার বাড়ির লোকজনের সাথে মিলে ফুরকানের ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে। কাপাসিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিনুর আলম বলেন, একাধিক কাগজে ফুরকানের লেখা অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেগুলোতে কোনো স্বাক্ষর নেই, কোনো তারিখ নেই। অন্য থানার নাম দেওয়া আছে। আমরা সেগুলো যাচাই করছি। তিনি আরও বলেন, ঘর থেকে মাদক সেবনের কিছু আলামত, রান্না করা সেমাই, কোকাকোলা ও একটি মদের বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। খাবারের সঙ্গে কোনো চেতনানাশক মেশানো হয়েছিল কিনা, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, উদ্ধার হওয়া কাগজপত্র দেখে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক বিরোধ থেকেই এ হত্যাকা-ের সূত্রপাত হতে পারে। অভিযোগে অর্থ আত্মসাৎ ও পরকীয়ার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছে। পলাতক ফোরকান মিয়াকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button