জ্বালানির পর এবার বাড়ল বিদ্যুতের দাম

পাইকারিতে প্রায় ২০, খুচরায় ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি
প্রবাহ রিপোর্ট : দেশে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বুধবার (৩ জুন) বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। পাইকারি পর্যায়ে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৫ থেকে ১৯.৯৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সঞ্চালন চার্জ ২৩. ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। গত ৩ থেকে ৬ মের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদক, সঞ্চালক ও বিতরণকারী সংস্থা-কোম্পানিগুলো বিইআরসিতে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম এবং সঞ্চালন মাশুল বাড়ানোর আবেদন করে।
গত ২০ ও ২১ মে বিইআরসির গণশুনানিতে রাজনৈতিক নেতা, ভোক্তা অধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, ভুল পরিকল্পনা ও অপচয়ের দায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপানো হচ্ছে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের গড় দাম ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৭০ থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছিল।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস/বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা ও কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকায় পুনর্র্নিধারণ করা হয়েছে। তবে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ফলে অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম লিটারে বেড়েছে ৫ টাকা। সোমবার (১ জুন) থেকে এ দাম কার্যকর করা হয়।
গ্রাহক পর্যায়ে কত ইউনিট বিদ্যুতের দাম কত হলো ? গ্রাহক পর্যায়ে লাইফ লাইনে প্রথম ৫০ ইউনিট ৫ টাকা ৩২ পয়সা, প্রথম ধাপে শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ৬ টাকা ১৮ পয়সা, দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ৮ টাকা ৫০ পয়সা, তৃতীয় ধাপে ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ৯ টাকা ১০ পয়সা, চতুর্থ ধাপে ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ৯ টাকা ৬২ পয়সা, পঞ্চম ধাপে ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ১৫ টাকা ১ পয়সা ও ষষ্ঠ ধাপে ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে, পাইকারিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। দাম বেড়েছে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
অন্যদিকে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)-এর সঞ্চালন ব্যয় বিবেচনায় বিদ্যুতের সঞ্চালন মূল্যহার (হুইলিং চার্জ) ভারিত গড়ে প্রতি ইউনিট ৩১.৩৫ পয়সা থেকে ৩৮.৮৬ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে ৭.৫১ পয়সা বা প্রায় ২৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
তবে বিভিন্ন গ্রাহক শ্রেণির বিদ্যমান ডিমান্ড চার্জ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কমিশনের এ আদেশ ২০২৬ সালের জুন মাসের বিল থেকে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে।
তাড়াহুড়া করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, কোনো চাপ ছিল না। বাজেট মাথায় রেখে দ্রুত করা হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দাম বাড়ানোর ফলে মানুষের ব্যয় বাড়বে, তবে অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়নি। এটা করার সুযোগ আছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গত ২০ ও ২১ এপ্রিল দুই দিনব্যাপী গণশুনানি আয়োজন করে বিইআরসি। সেখানে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পিডিবি প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করেছিল।
পাইকারিতে প্রায় ২০, খুচরায় ১৫-২০ শতাংশ বাড়লো বিদ্যুতের দাম : গ্রাহক ও পাইকারি—উভয় পর্যায়ে বাড়লো বিদ্যুতের দাম। গণশুনানির বিশ্লেষণ শেষে খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন এই মূল্যহার চলতি জুন মাসের বিল থেকেই কার্যকর হবে।
বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন গ্রাহকশ্রেণির বিদ্যমান খুচরা বিদ্যুতের দাম ভারিত গড় (ওয়েইটেড অ্যাভারেজ) প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা পুনর্র্নিধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, একক ক্রেতা হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও আমদানি ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে পাইকারি (বাল্ক) মূল্যহার ভারিত গড় প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়লেও বিউবোর অবশিষ্ট ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
সঞ্চালন মূল্যহারও বৃদ্ধি, ডিমান্ড চার্জ অপরিবর্তিত : পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবিপিএলসি)-এর সঞ্চালন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুতের বিদ্যমান সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ ভারিত গড় প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ০ দশমিক ৩১৩৫ টাকা থেকে ০ দশমিক ০৭৫১ টাকা বাড়িয়ে ০ দশমিক ৩৮৮৬ টাকা পুনর্র্নিধারণ করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন গ্রাহকশ্রেণির বিদ্যমান ডিমান্ড চার্জ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
মে মাসে প্রস্তাব, জুনেই কার্যকর : এর আগে, মে মাসের শুরুতে বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন এবং খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের জন্য বিউবো, পিজিসিবিপিএলসি, নেসকো, ডেসকো, ওজোপাডিকো, বাপবিবো ও ডিপিডিসি কমিশনে আলাদা আলাদা প্রস্তাব দাখিল করে। এসব প্রস্তাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০ ও ২১ মে গণশুনানি গ্রহণ করে বিইআরসি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সব পক্ষের আবেদন, দলিলাদি এবং গণশুনানি শেষে বিশদ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণপূর্বক বিদ্যুতের উৎপাদন, ক্রয়, আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় এবং সরকারের ভর্তুকির সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩’ এর ২২(ঘ) ও ৩৪ ধারা মোতাবেক এ মূল্যহার পুনর্র্নিধারণ করা হয়েছে। এই আদেশ পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।


