পুঁজিবাজার ঢেলে সাজানোর বিরাট পরিকল্পনা বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যানের

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এক সংবাদ সম্মেলনে তার বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। এসময় তিনি দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি ভবনে অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে মাসুদ খান বলেন, ‘আমাদের বেসরকারি খাত বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে এবং নতুন নতুন ধারণা ও উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে। নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমাদের অর্থনীতি বারবার তার প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের পুঁজিবাজার অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতই হবে।’ উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার সকালেই বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। এর পরপরই মাসুদ খানকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। নিয়োগ পাওয়ার পর বিএসইসি ভবনে যান মাসুদ খান। সেখানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিগত বছরগুলোতে আমাদের পুঁজিবাজার প্রবৃদ্ধি ও আশাবাদের অনেক সময় অতিক্রম করেছে। তবে একই সঙ্গে এমন কিছু চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করেছে, ভালো মানের কোম্পানিগুলোকে বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করেছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমিয়েছে এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের অবদানকে সীমিত করেছে।’ মাসুদ খান আরও বলেন, ‘অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেক ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একসময় বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন আরও সতর্ক। মিউচুয়াল ফান্ড শিল্প, যা আমাদের পুঁজিবাজারের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল, সেটিও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।’ চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের ভিশন অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য, প্রাতিষ্ঠানিক ও ইমার্জিং মার্কেটে রূপান্তর করতে চাই, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মূলধন সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে। আমি সেই নীতিমালাগুলো তুলে ধরতে চাই, যা এই কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং যে দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নিতে চাই।’ এ সময় তিনি আরও স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ এবং যেখানে সম্ভব নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণের কথা বলেন। এই উদ্যোগ বর্তমান সরকারের পুঁজিবাজার উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। মাসুদ খান বলেন, ‘সুশাসিত ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং বাজারের বিকাশকে ধীর করে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজারে অসংখ্য রিপোর্টিং বাধ্যবাধকতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া, দাখিলপত্র এবং কমপ্লায়েন্স প্রয়োজনীয়তা যুক্ত হয়েছে। এসবের অনেকগুলোই পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।’ বিনিয়োগকারী সুরক্ষা অক্ষুণœ রেখে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে কমিশন বিদ্যমান বিধিমালা, রিপোর্টিং প্রয়োজনীয়তা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার একটি ব্যাপক পর্যালোচনা করবে বলে জানান মাসুদ খান। তিনি বলেন, ‘আমরা ধীরে ধীরে আরও নীতিনির্ভর এবং ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হতে চাই। তাৎক্ষণিক উদাহরণ হিসেবে আমরা মধ্যবর্তী আর্থিক প্রতিবেদনের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করব।’ তবে আন্তর্জাতিক মানদ-ের চেয়েও অধিক বিস্তৃত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন দাখিলের বর্তমান চর্চা তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য ব্যয় চাপিয়ে দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্সের বোঝা সৃষ্টি করে বলে মনে করেন তিনি। এ কারণে ত্রৈমাসিক রিপোর্টিং, অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টের কাঠামো এবং তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতাগুলো পুনর্বিবেচনা করার প্রতিশ্রুতি দেন কমিশন চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন পুনরাবৃত্তিমূলক রিপোর্টিং ও দাখিল প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করব, যা ব্যয় বৃদ্ধি করে কিন্তু প্রকৃত কোনো মূল্য সংযোজন করে না। আমাদের দর্শন অত্যন্ত সহজÑ যেখানে প্রয়োজন সেখানে নিয়ন্ত্রণ, যেখানে সম্ভব সেখানে সরলীকরণ।’ নবনিযুক্ত কমিশন চেয়ারম্যান বলেন, ‘আধুনিক পুঁজিবাজার কাগজনির্ভর প্রক্রিয়া এবং ম্যানুয়াল কার্যপ্রবাহের মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হতে পারে না। তাই ডিজিটাইজেশন আমাদের সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হবে। আমরা ধাপে ধাপে পুরো পুঁজিবাজার ইকোসিস্টেমকে ডিজিটাল রূপান্তরের আওতাভুক্ত করতে চাই। এর মধ্যে থাকবে নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিং, কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, লাইসেন্সিং, অনুমোদন, বাজার তদারকি, আইন প্রয়োগ এবং বিনিয়োগকারী সেবা। আইপিও আবেদন, রাইটস ইস্যু, বন্ড ও সুকুক আবেদন, লাইসেন্সিং কার্যক্রম এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক দাখিলপত্র ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হবে।’ ‘আমরা চাই বিনিয়োগকারী এবং কোম্পানিগুলো যেন নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে, দক্ষতার সঙ্গে এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যোগাযোগ করতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা হবে দ্রুততর, অধিক স্বচ্ছ, অধিক দক্ষ এবং অংশীজনদের জন্য অধিকতর সহজলভ্য। প্রযুক্তি যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমায়, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করে এবং নিয়ন্ত্রক সম্পদকে অধিক মূল্য সংযোজনকারী তদারকি কার্যক্রমে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে’, যোগ করেন মাসুদ খান। ভালো মানের সিকিউরিটিজের সরবরাহ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির ঘাটতি। বাংলাদেশের অনেক শক্তিশালী ও সফল কোম্পানি এখনও পুঁজিবাজারের বাইরে রয়েছে। বাংলাদেশে সফলভাবে পরিচালিত বহু বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত নয়। অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানও এখনও বাজারের বাইরে রয়েছে। একইভাবে, অনেক সফল স্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান জনসাধারণের মালিকানাভিত্তিক কোম্পানি হওয়ার উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এখনও ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। একটি প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী পুঁজিবাজারের জন্য প্রয়োজন ভালো মানের সিকিউরিটিজের পর্যাপ্ত সরবরাহ। আমরা বহুজাতিক কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বৃহৎ স্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করব এবং তাদের পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর ডাইরেক্ট লিস্টিং কাঠামো প্রবর্তনের উদ্যোগ নেব, যার মাধ্যমে উপযুক্ত কোম্পানিগুলো নতুন মূলধন সংগ্রহ ছাড়াই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। আমাদের লক্ষ্য হলো দ্রুত ভালো মানের সিকিউরিটিজের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা। একই সঙ্গে আমরা নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করব যাতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।’ বাজারের সততা ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই এবং সিডিবিএলকে সমন্বিত করে একটি রিয়েল-টাইম নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলার কথা জানান চেয়ারম্যান। প্রাথমিক পর্যায়ে সুশাসন ও তথ্য প্রকাশের ঝুঁকি থাকা ‘জেড’ ক্যাটাগরির সিকিউরিটিজের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হবে এবং ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং কিংবা পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্পের মতো কারসাজি রোধে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে তাৎক্ষণিক লেনদেন স্থগিত করার ক্ষমতা দেওয়া হবে। তবে কমিশনের উদ্দেশ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ বা বাজারের স্বাভাবিক উত্থান-পতন ঠেকানো নয়, বরং ন্যায্য মূল্য আবিষ্কার নিশ্চিত করা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মূল্য নির্ধারণ করবে বাজার, কোনো কারসাজি নয়; তাই সৎ বিনিয়োগকারীদের ভয়ের কিছু না থাকলেও আইন লঙ্ঘনকারীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এছাড়া বন্ড, সুকুক, ইটিএফ, আরই্আটি বা কমোডিটি এক্সচেঞ্জের মতো নতুন আর্থিক পণ্য সঠিক সময়ে ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলে ধারাবাহিকভাবে চালু করা হবে। বিনিয়োগকারী সুরক্ষার প্রশ্নে তিনি ঘোষণা করেন যে, নীতিগতভাবে ফ্লোর প্রাইস কোনো স্থায়ী বাজার ব্যবস্থা হতে পারে না, তাই ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে। সমাপনী বক্তব্যে মাসুদ খান বলেন, কমিশনের সাফল্য ঘোষণার মাধ্যমে নয়, বরং বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হবে। কমিশন সকল অংশীজনের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ ও যোগাযোগের মাধ্যমে যৌক্তিক সমস্যার সমাধান করবে, তবে বাজারের শৃঙ্খলা বা আইনের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। সরকার ইতোমধ্যে অত্যন্ত সতর্ক ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিন জন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কমিশনার নিয়োগ দিয়েছে এবং চতুর্থ কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠন হলে সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় পুঁজিবাজারে আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠন করে এটিকে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত শক্তির প্রতিফলক হিসেবে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে নবনিযুক্ত তিন কমিশনার নাফিজ আল তারিক, নাহিদ মাহতাব ও তানভীর হাবিব রহমান ও বিএসইসির নির্বাহী পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



