ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি জরুরি: তাসনিম জারা

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কেবল ভাইরাল হলে তবেই আলোচনায় আসে, এমন সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে স্থায়ীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ তাসনিম জারা। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর বাংলামোটরের বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত “আর না ধর্ষণ, শিশু নিপীড়ন, বিচারহীনতা: কোন পথে সমাধান?” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী নাগরিক উদ্যোগ ‘আর না+’ এ আয়োজন করে। তাসনিম জারা বলেন, বর্তমানে ধর্ষণ বা শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটলে আমরা কেবল তখনই সক্রিয় হই, যখন তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় বা ব্যাপক আলোচনায় আসে। কিন্তু কাঠামোগতভাবে এসব অপরাধ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার যে ধারাবাহিক ব্যবস্থা থাকা দরকার, তা অনুপস্থিত। তিনি বলেন, “শুধু কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে আমরা মনোযোগ দিই- এমন হওয়া উচিত নয়। বরং আমাদের এমন একটি সিস্টেম থাকা দরকার, যেখানে শিশু নির্যাতন বা নারী নির্যাতনের ঘটনা শুরু থেকেই ট্র্যাক করা হবে, বিচার হচ্ছে কি না, ফলোআপ হচ্ছে কি না, সবকিছু নিয়মিতভাবে নজরদারির মধ্যে থাকবে।” তাসনিম জারা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের নির্ধারিত ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তির বিধান উল্লেখ করে বলেন, আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে, সেটিই মূল প্রশ্ন। তিনি বলেন, “আইন আছে, কিন্তু কয়টি মামলায় এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে? কেন হচ্ছে না- এটা নিয়মিতভাবে রিভিউ করতে হবে।” তিনি বলেন, পুলিশ, ফরেনসিক টিম এবং বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতা ছাড়া শুধু আইন দিয়ে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে ফরেনসিক তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। এসময় তিনি একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড বা ট্র্যাকিং সিস্টেম তৈরির প্রস্তাব দেন, যেখানে প্রতিটি ধর্ষণ বা নির্যাতনের মামলার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে মনিটর করা হবে। তাসনিম জারা বলেন, “কোন মামলার কী অবস্থা, কত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হলো, কেন বিলম্ব হলো-এগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ট্র্যাক না করলে আমরা কখনোই গ্যাপগুলো বুঝতে পারব না।” তিনি বলেন, একটি কেন্দ্রীভূত জবাবদিহি ব্যবস্থা না থাকলে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না, ফলে একই সংকট বারবার চলতে থাকে। ভুক্তভোগীবান্ধব সেবার ঘাটতি প্রসঙ্গে এই রাজনীতিবিদ বলেন, ভুক্তভোগীদের জন্য ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারসহ বিভিন্ন সেবা কাঠামো থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাসনিম জারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই এসব সেন্টারে প্রয়োজনীয় জনবল, প্রশিক্ষণ ও জেন্ডার সেনসিটিভ সাপোর্ট নেই। ফলে ভুক্তভোগীরা কাক্সিক্ষত চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও মানসিক সেবা একসঙ্গে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “কাগজে সেবা আছে, কিন্তু বাস্তবে সেই সেবার মান কতটা, তা আমাদের জানা দরকার। ভুক্তভোগীরা আদৌ সঠিক সহায়তা পাচ্ছেন কি না, সেটাও নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।” জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাসনিম জারা বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য কার্যকর হটলাইন এবং স্থানীয় পর্যায়ের দ্রুত রেসপন্স টিম থাকা দরকার। তিনি বলেন, কোনো শিশু বা নারী যদি ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে কল করার সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী পুলিশ ইউনিট দ্রুত পৌঁছে সহায়তা দিতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। অনেক সময় ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়, যা বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাসনিম জারা বলেন, “এই ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক পয়েন্ট বানানোর পরিবর্তে আমাদের সিস্টেমের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সত্যিকারের সমাধানের দিকে যেতে হবে।” ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মতো ভয়াবহ ঘটনা প্রতিরোধে সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ভাইরাল হলে আলোচনা হবে, এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিচার নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তাসনিম জারা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সব অংশীজন একসঙ্গে কাজ করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।



