দীর্ঘ কারাবাসে দৃষ্টি হারিয়েছেন ফাঁসির দুই আসামি

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা মৃত্যুদ-প্রাপ্ত এক বন্দি সম্পূর্ণভাবে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। চিকিৎসকদের মতে, তার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। আরেক বন্দির একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। অপর চোখটি রক্ষায় তার চিকিৎসা চলছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (কেরানীগঞ্জ), কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে ২৭০৮ জন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন। তাদের সবার রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১ হাজার ৪০০ বন্দি রয়েছেন কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের হাই সিকিউরিটিতে। দীর্ঘদিন ধরে আপিল ও আইনি প্রক্রিয়া নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অনেক বন্দি বার্ধক্যজনিত ও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দি ওসমান গণি ওরফে কসাই ওসমান (কয়েদি নং-৮৩২৫/এ)। তিনি ফরিদপুরের পূর্ব খাবাসপুর এলাকার বাসিন্দা। ২০০৮ সালের ১২ এপ্রিল তাকে নরসিংদী জেলা কারাগারে আনা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে স্থানান্তরের পর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ রাখা হয়। চলতি বছর তাকে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। মনোহরদী থানার একটি হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদ- হয়। কারা নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ থাকা অবস্থায় তার চোখে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। পরের বছর, ২০১৯ সালে তিনি সম্পূর্ণভাবে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করালেও তার দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে আসেনি। অন্যদিকে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দি মো. নজরুল মিয়া (কয়েদি নং-১৫০/এ) মুন্সীগঞ্জের চরকিলোরগঞ্জ যোগীনিঘাট এলাকার বাসিন্দা। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের এক হত্যা মামলায় ২০০৯ সালের ২৯ জুলাই তার মৃত্যুদ- হয়। ২০১২ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে কাশিমপুরে স্থানান্তর করা হয়। নজরুল মিয়ার একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ২৬ জুন তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে (কেরানীগঞ্জ) স্থানান্তর করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুদ-ের আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা অনেক বন্দি বয়সজনিত নানা শারীরিক জটিলতা ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। শনিবার (১১ জুলাই) কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের হাই সিকিউরিটির সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, হাই সিকিউরিটিতে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ জন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের মৃত্যুদ-ের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন। তিনি জানান, এসব বন্দির মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আছেন। এমনও বন্দি আছেন, যাদের দুই যুগেরও বেশি সময় কারাগারে কাটলেও আপিলের শুনানি এখনো চলমান। শুরুতে স্বজনরা নিয়মিত দেখা করতে এলেও সময়ের ব্যবধানে অনেকের সঙ্গেই আত্মীয়-স্বজনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অনেক বন্দির কাছে এখন আর কেউ সাক্ষাৎ করতেও আসেন না। আব্দুল্লাহ আল মামুন আরও বলেন, অনেক মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দির আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তারা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না। এ কারণে আইন অনুযায়ী সরকারি ব্যবস্থাপনায় কারা কর্তৃপক্ষ তাদের আপিল পরিচালনার ব্যবস্থা করেছে। তিনি আরও জানান, কারাগারে থাকা অবস্থায় একজন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দি সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ থাকা অবস্থায় তার দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায়। কারা কর্তৃপক্ষ তার চিকিৎসার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও দৃষ্টিশক্তি আর ফেরানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তিনি হাই সিকিউরিটি কারাগারেই রয়েছেন। এ ছাড়া আরেক মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দির একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে (কেরানীগঞ্জ) স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানান এই জেল সুপার। তিনি বলেন, দুই চোখে দৃষ্টিশক্তিহীন ওই বন্দির চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়াসহ দৈনন্দিন কাজে অন্য মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দিরাই সহযোগিতা করেন। তারাই এখন তার আত্মীয়-স্বজন। কারাগারের ভেতরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কারারক্ষীরাও তার খোঁজখবর রাখেন। অন্য বন্দিদেরও তাকে সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত অনেক বন্দিই বছরের পর বছর কারাগারে অবস্থান করছেন। তারা সবাই মৃত্যুদ-ের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন এবং সেই আপিলের বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলমান। বর্তমানে অন্তত ৬১ জন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দি ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। চিকিৎসকরা যা বলছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের এক সাবেক সিনিয়র চিকিৎসক বাংলানিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দিজীবন কাটানো একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। বছরের পর বছর সীমিত পরিসরে বসবাস, মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা, পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকা-ের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের কারণে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ফাঁসির দ-প্রাপ্ত বা দীর্ঘদিন ধরে আপিল বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে মানসিক চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। এই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং আগে থেকে থাকা বিভিন্ন রোগকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বন্দির অসুস্থতার কারণ নিশ্চিত করতে চিকিৎসা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত তথ্য প্রয়োজন। এই চিকিৎসক আরও বলেন, কারাগারে সাধারণত পুষ্টিকর ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের ঘাটতি থাকে। প্রতিদিন প্রায় একই ধরনের খাবার খেতে হয়। ফলমূলের ব্যবস্থা তো দূরের কথা। এর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা যুক্ত হয়ে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সময় রোদে থাকার সুযোগ না থাকলেও নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর কারাভোগের পর চিকিৎসার জন্য আসা অনেককে গুরুতর চর্মরোগে আক্রান্ত অবস্থায় দেখা যায়। অনেকের ক্ষেত্রে মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ত্বকের বিভিন্ন জটিল রোগ ছড়িয়ে থাকে। পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তির সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা নিয়েও সাবেক কারাবন্দিরা চিকিৎসা নিতে আসেন। মেডিসিন বিভাগের আওতায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়ার পর রোগের ধরন অনুযায়ী তাদের চর্মরোগ, চক্ষু বা সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের (কেরানীগঞ্জ) সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ জানান, বর্তমানে কারাগারের কনডেমড সেলে ৮৪ জন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন। তাদের সবার মৃত্যুদ-ের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন রয়েছে। কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও উন্নয়ন) মো. জান্নাত উল ফরহাদ জানান, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে মোট ২ হাজার ৭০৮ জন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৬১৫ জন পুরুষ এবং ৯৩ জন নারী। এসব দ-প্রাপ্ত বন্দির প্রত্যেকের রায়ের বিরুদ্ধে বর্তমানে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন রয়েছে। উল্লেখ্য, কনডেমড সেল হলো কারাগারে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বা ফাঁসির আসামিদের রাখার জন্য নির্ধারিত বিশেষ ও নির্জন সেল। সাধারণত আদালতের রায়ে মৃত্যুদ- ঘোষণার পর থেকে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত কয়েদিদের এই পৃথক সেলে রাখা হয়। পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে সব বন্দিকে কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরে নবনির্মিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। তবে পুরান ঢাকার কারাগারের কনডেমড সেলের পরিবেশ যতটা কঠোর ও ভীতিকর ছিল, কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি কারাগারে পরিস্থিতি তেমন নয়। বর্তমানে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বন্দিদের জন্য পৃথক একটি ভবনের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে একেকটি কক্ষে কয়েকজন করে বন্দিকে রাখা হয়। নির্ধারিত সময়ে তারা হাঁটাচলা করতে পারেন। কেউ চাইলে খেলাধুলাও করতে পারেন।



