জাতীয় সংবাদ

শাপলা চত্বর হত্যা মামলার প্রধান আসামি শেখ হাসিনা

৪১ জনকে অভিযুক্ত করে ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন জমা
উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন- সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও একেএম শহিদুল হক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা ও শাহরিয়ার কবীর।

প্রবাহ রিপোর্ট : ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় করা মামলায় ৪১ জনকে আসামি করে তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে জমা দেওয়া হয়েছে। রোববার সকালে এ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় অন্যান্য আসামি হলেন- সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও একেএম শহিদুল হক এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান।
এছাড়াও মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু, সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর।
এদিকে,শাপলা চত্ত্বর হত্যাযজ্ঞের মামলার অগ্রগতি জানতে রোববার চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে যান হেফাজতের শীর্ষ নেতারাসহ ১০-১৫ জনের একটি টিম।
তদন্ত সংস্থার কাছ থেকে খসড়া প্রতিবেদন পাওয়ার পর রোববার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে চিফ প্রসিকিউটর এবং হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
বৈঠকে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ পীর, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিস এবং জুবায়ের আহমেদ। এ ছাড়া তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর অ্যাডিশনাল আইজিপি শহীদুল্লাহ এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
খসড়া প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা, পুলিশ ও বিজিবি প্রধান : মামলার আসামিদের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘খসড়া তালিকায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। সেখানে পুলিশ প্রধান, বিজিবি প্রধানসহ এরকম কয়েকজন আমরা মোটা দাগে বলতেই পারি যে তাদের বিরুদ্ধে একটা খসড়া রিপোর্ট এসেছে, সেটা আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব।’
তবে এখনই সব আসামির নাম প্রকাশে অনীহা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসামিদের তালিকা যেহেতু একটি খসড়া, চূড়ান্ত প্রতিবেদন যেহেতু আমরা রিসিভ করিনি, তালিকাটা আমরা প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। অনেক আসামি আছে, তারা হয়তো এখনো গ্রেফতার হয়নি। নাম প্রকাশ করলে সেই আসামিদের গ্রেফতার করতে অসুবিধা হবে।’
‘সাধারণ আদালতের বদলে ট্রাইব্যুনালে এই বিচার কেন হচ্ছে’— এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর এটিকে সুপরিকল্পিত ও সিস্টেমেটিক হত্যা বলে আখ্যা দেন।
তিনি বলেন, ‘এটা অবশ্যই একটা সিস্টেমেটিক অফেন্স। এটা ওয়াইড স্প্রেড এবং টার্গেটেড কিলিং। সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি আছে, লোকাল পারপেট্রেটরদের ইনভলবমেন্ট আছে। পরিকল্পিতভাবে হেফাজতে ইসলাম যখন প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল, তখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এই জনগোষ্ঠীকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্যে তারা নানান পরিকল্পনা গ্রহণ করে।’
আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারের চূড়ান্ত জায়গা থেকে তাদের কোথাও বসতে দেওয়া হয়নি। এটা শুধু ঢাকায় নয়, নারায়ণগঞ্জে ঘটেছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ঘটেছে। রাষ্ট্রের সকল অর্গানকে এটার বিরুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়। আমি মনে করি, এটি এই ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত সবচেয়ে উপযুক্ত একটি ঘটনা।’
নিহতের সংখ্যা ও হেফাজতের অবস্থান : নিহতের সংখ্যা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা প্রায় ৬১ জনের একটা তালিকা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা ৫৮ জনকে ইতোমধ্যে আইডেন্টিফাই (শনাক্ত) করতে পেরেছি।’
এ সময় নিহতের সংখ্যা নিয়ে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘নিহতদের যে সংখ্যা, এই সংখ্যাটা আসছে আমাদের আলোচনাতেও এবং তদন্তের মধ্য দিয়ে তাদের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। আমরা আগাগোড়াই বলছি যে এখানে অনেক মিসিং (নিখোঁজ) আছে, যাদের কোনো হদিসই নাই। রাষ্ট্রীয়ভাবে তৎকালীন শাপলার শহীদদের গুম করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।
নিহতদের পরিচয় প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, ‘এখানে শহীদদের মধ্যে আমাদের স্টুডেন্টদের পোরশনটা (অংশ) কিন্তু খুবই কম।’
সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ, ইউনিভার্সিটির ছাত্র, বুয়েটের ছাত্র, ট্রাক ড্রাইভার, শ্রমিক, তৎকালীন প্রায় সবগুলো বিরোধীদলের রাজনৈতিক কর্মীরাও এই শহীদদের তালিকার মধ্যে আছেন বলেও দাবি করেন হেফাজতের এই নেতা।
খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে সন্তুষ্টির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা যেটুকু দেখেছি, কিছু টুকটাক কারেকশন আছে। আমরা আরেকটু পর্যালোচনা করে দুই-একদিনের মধ্যেই কারেকশনের কথাগুলো উনাদেরকে বলব। তবে আমাদের যে এক্সপেক্টেশন (আশা) ছিল, আমাদের যে অভিযোগ ছিল, এই খসড়া রিপোর্ট তার কাছাকাছিই আছে।’
পুলিশের তদন্তে পক্ষপাতিত্বের শঙ্কা নাকচ : মামলার তদন্তে কোনো চাপ ছিল না জানিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম বলেন, ‘এখানে কাউকে বাদ দেওয়া বা কাউকে ঢুকানোর ব্যাপারে আমাদের ওপর কোনো চাপ ছিল না। শুরু থেকে প্রসিকিউশন টিম আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে ছিল। প্রত্যেকটা বিষয়ে উনাদের কনসার্ন নেওয়া হয়।’
পুলিশ হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তে নিরপেক্ষতা কতটুকু থাকছে— এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আইন অনুযায়ী ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া আছে। আমরা তো বহু পুলিশকে আসামি করেছি। কে পুলিশ, কে পাবলিক— এইভাবে দেখে ইনভেস্টিগেশন হয় না। আমরা অপরাধীকে দেখে ইনভেস্টিগেশন করি।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আপনাদের এই আশঙ্কা থাকার কোনো কারণ নাই যে পুলিশ হলে পুলিশের পক্ষপাতিত্বের কোনো জায়গা আছে। এই মামলার মধ্যেও দেখবেন যে, বেশি সংখ্যক মানুষ কিন্তু পুলিশই হবে।’
২১ জুলাই ফরমাল চার্জ দাখিল
মামলার পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমাদের কোনো আসামি যদি নিরপরাধ হয় তাকে আমরা আনব না। কিন্তু কোনো দোষী আসামি যাতে বাদ না পড়ে যায়, সেজন্যে আমরা এই সতর্কতা অবলম্বন করছি। সেই কারণেই আমরা হেফাজতের নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে আলোচনা করলাম, পরামর্শ নিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আশা করছি যে, আগামী ২১ তারিখে আমাদের ট্রাইব্যুনাল খোলার দিনই আমি বাদী হয়ে আমাদের ফরমাল চার্জটা দাখিল করতে চাই।’
এর আগে গত ৮ জুলাই চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন, ১৩ বছর আগের ওই ঘটনার তদন্ত ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং খসড়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই চলছে।
সেই সময় তিনি বলেছিলেন, ট্রাইব্যুনালের অবকাশকালীন ছুটি শেষে ২১ জুলাই বিচার কাজ শুরু হলে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল সাপেক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) জমা দেওয়া হবে।
এই মামলায় আসামির তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ আরও অনেকের নাম উঠে এসেছে। এ ছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা ও শাহরিয়ার কবীরও এই মামলায় আসামি হচ্ছেন বলে প্রসিকিউশন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button