ভারতে ভেঙ্গে ফেলা হলো ৭০ বছরের পুরোনো মসজিদ : মুসলিমদের ক্ষোভ

মুসলিমদের কি ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই : ওয়াইসি
প্রবাহ ডেস্ক : ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে সরকারি জমি ‘দখল’ করে নির্মাণের অভিযোগে প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ভোরে জেলাশাসকের (ডিএম) কার্যালয় চত্বরে নির্মিত এই মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়। আদালত কর্তৃক পূর্ববর্তী মসজিদ ভাঙার আদেশ বহাল রাখার পরপরই এ ঘটনা ঘটলো।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ওই স্থানে ‘অবৈধ দখলের’ মাধ্যমে ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ ও দীর্ঘদিন ব্যবহারের জন্য আদালতের নির্দেশে মসজিদ কমিটিকে ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১৭ জুলাই আদালত প্রথম মসজিদটিকে বেআইনি ঘোষণা করে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের সেই উচ্ছেদ আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে বিবাদী মুসলিম পক্ষ আপিল করলেও গত ৪ সেপ্টেম্বর জেলা জজের আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি-তর্ক পর্যালোচনা শেষে তা খারিজ করে দেন। এবং পূর্বের নির্দেশ বহাল রাখেন। স্থানীয় মসলিমদের দাবি, ওই মসজিদটির বয়স প্রায় ৭০ বছর। নির্মাণের পর থেকে মসজিদের রাজস্ব রেকর্ড রয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, বজরং দলের সাবেক প্রাদেশিক সমন্বয়কারী বিকাশ ত্যাগীর এক লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে এই আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। অভিযোগে বলা হয়েছিল, অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া সরকারি কালেক্টরেট প্রাঙ্গণে ‘অবৈধভাবে’ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে স্থানটিতে ডাকঘর পরিচালনা ও কক্ষ ভাড়া দিয়ে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারেরও অভিযোগ আনা হয়।
শনিবার ভোরে বুলডোজার চালনার সময় সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট (এসডিএম) ও সিটি ম্যাজিস্ট্রেটসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। কালেক্টরেট চত্বরের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রভিন্সিয়াল আর্মড কনস্ট্যাবুলারিসহ (পিএসি) বিপুল পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। এছাড়া প্রাঙ্গণের সব প্রবেশপথ বন্ধ রাখা হয়।
মুসলিমদের তীব্র ক্ষোভ : রাজ্য সরকারের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ভাঙার ঘটনায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে। তাদে দাবি, আইনি লড়াইয়ের জন্য হাইকোর্টে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে তাদের। তারা সে পথেই এগোলেও প্রশাসন আগ বাড়িয়ে বিবাদমান স্থাপননি বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছে।
সাবেক সাংসদ ফজলুর রহমান প্রশাসনকে কোনো হঠকারী পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বিষয়টি এখন হাইকোর্টে আইনি লড়াই করা হবে। আইনি প্রতিকার চাওয়ার জন্য মসজিদ কর্তৃপক্ষের কাছে এখনো প্রায় ২২ দিন সময় আছে। কিন্তু চূড়ান্ত রায় না হওয়ার আগেই মসজিদটি ধ্বংস করে দেওয়া হলো।
কংগ্রেস সাংসদ ইমরান মাসুদও বলেছেন, মুসলিমরা হাইকোর্টে যাবে। বিতর্কিত জমির রাজস্ব রেকর্ডে ওয়াহিদ খান ও ইয়াকুব খানের নাম রয়েছে। ধর্মীয় স্থাপনাটির দীর্ঘদিনের উপস্থিতি ও ঐতিহাসিক রাজস্ব রেকর্ড বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
কাইরানা থেকে সমাজবাদী পার্টির (এসপি) সাংসদ ইকরা হাসান সাহারানপুর যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে বাধা দেয়। তার দাবি, শুক্রবার গভীর রাতে কাইরানায় তার বাসভবনের বাইরেও বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। তারা তাকে বের হতে বাধা দিচ্ছিল। কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে ও পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে সাহারানপুর যেতে চেয়েছিলেন তিনি।
মুসলিমদের কি ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই-ভারতে মসজিদ ধ্বংসের তীব্র নিন্দা ওয়াইসির : ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর কালেক্টরেট চত্বরে থাকা মসজিদ ভেঙে ফেলার তীব্র নিন্দা করেছেন সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। তিনি দাবি করেন, ১৯১১ সাল থেকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক নথিতে ওই স্থানে মসজিদের অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। এ সময় তিনি বলেন, ‘শুধু আপনাদের মনে খচখচের কারণে আমাদের মসজিদ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিতে পারেন না।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ওয়াইসি প্রশ্ন তোলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা কি মুসলমানদের জন্য আর প্রযোজ্য নয়? কেন আমাদের উপাসনালয়গুলো ক্রমাগত তুচ্ছ কারণে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়?
ওয়াইসি বলেন, “মসজিদ কমিটি এর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে ১৯১১ সাল পর্যন্ত পুরোনো নথি উপস্থাপন করেছিল। সেখানে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে নামাজ আদায় করা হয়েছে। এটিই ‘ওয়াকফ বাই ইউজার’-এর প্রকৃত সংজ্ঞা, যা এখনো আইনের অধীনে ওয়াকফ হিসেবে সুরক্ষিত।”
সরকারের ওই সম্পত্তির ওপর দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ওয়াইসি। এ ক্ষেত্রে তিনি তামাদি আইন এবং স্থাবর সম্পত্তির দখলসংক্রান্ত বিধানের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “তামাদি আইন সাধারণত সরকারকে কোনো স্থাবর সম্পত্তির দখল দাবি করার জন্য সীমাহীন সময় অপেক্ষা করে এক সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই সম্পত্তির মালিকানা দাবি করার সুযোগ দেয় না।”
দীর্ঘদিনের দখলকে সম্পত্তিটির আইনগত অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলেও যুক্তি দেন তিনি।
এআইএমআইএম প্রধান বলেন, “এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রকাশ্য, ধারাবাহিক ও সর্বসাধারণের সামনে দখল ছিল না কি? রাষ্ট্র এমন ভান করতে পারে না যে এই দখল গতকাল থেকে শুরু হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের যুক্তি মেনে নিলেও ‘অ্যাডভার্স পজেশন’ বা দীর্ঘদিনের বিরোধী দখলের নীতি এখানে প্রযোজ্য হবে।” ওয়াইসি আরও দাবি করেন, কালেক্টরেট প্রতিষ্ঠার আগেই মসজিদটি সেখানে ছিল। তিনি বলেন, “মসজিদ আগে এসেছে, কালেক্টরেট পরে।” এরপর তিনি বলেন, “কিছু মানুষের কাছে হয়তো মসজিদ দেখাটাই কষ্টের কারণ। সেটা তাদের সমস্যা, আমাদের নয়।”
তিনি আরও বলেন, “প্রয়োজনে চোখ ফিরিয়ে নিন। শুধু আপনাদের মনে খচখচ করছে বলে আমাদের মসজিদ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিতে পারেন না। আমার ধর্মীয় স্বাধীনতা আপনার দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়।”
সাহারানপুর কালেক্টরেটে মসজিদটি ভেঙে ফেলার কাজ শুরুর পর ওয়াইসি এসব মন্তব্য করেন। একটি আদালতের আদেশে মসজিদটি অপসারণের সিদ্ধান্ত বহাল থাকার পরই এর ধ্বংসকাজ শুরু হয়।
গত ৪ সেপ্টেম্বর জেলা জজের আদালত মসজিদ কমিটির করা আপিল খারিজ করে এবং সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আগের আদেশ বহাল রাখেন। এর আগে ১৭ জুলাই সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত মসজিদটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল। পাশাপাশি, সরকারি জমিতে কথিত অবৈধ দখল ও অপব্যবহারের অভিযোগে প্রায় ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয়েছিল। অনলাইনক্যালকুলেটর ব্যবহার : সাহারানপুরের ডিআইজি অভিষেক সিং বলেন, সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত মসজিদটিকে সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত বলে রায় দিয়েছিল এবং পরবর্তী আপিলও খারিজ হয়ে যায়।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কৌশলগত বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ছড়ানো ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি করা হচ্ছে।
মসজিদটি ভেঙে ফেলার ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ইকরা হাসান অভিযোগ করেছেন, সাহারানপুর যাওয়ার চেষ্টা করার সময় তাকে কাইরানায় গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল।
কংগ্রেস সাংসদ ইমরান মাসুদও মসজিদটি ভেঙে ফেলার সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, মসজিদটি ১৯১১ সালেরও আগে থেকে সেখানে ছিল। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ওয়াকফ বোর্ডকে মামলার পক্ষ করা হয়নি এবং বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলা করা হবে। রাজনৈতিকবিশ্লেষণ পরিষেবা
সূত্র: ডেকান ক্রনিকল



