জাতীয় সংবাদ

পুলিশ গেটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে গুলি করতে থাকে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ

প্রবাহ রিপোর্ট : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে করা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ১১ নম্বর সাক্ষী মেসবাহ উদ্দীন আহমেদ। যিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ছিলেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সোমবার (১৯ অক্টোবর) তিনি জবানবন্দি দেন।
আসামি সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক এবং জুনাইদ আহমেদ পলক গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। জয় ও পলকের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা জয় এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী পলকের বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
সেগুলো হলো- এক. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের অনুমোদনে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই দিবাগত রাত সোয়া ১২টায় তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন।
সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫শে মার্চ ছাত্র-শিক্ষকদের গণহত্যা করেছে রাজাকাররা, সেই রাজাকারদের পক্ষে রাজাকারের সন্তান বলে স্লোগান দিতে লজ্জা করে না?’
এ ছাড়া আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার প্রতিবাদী রূপক অর্থে বলা ‘রাজাকার’ স্লোগানের বিরুদ্ধে উসকানিমূলকভাবে একই দিন রাত পৌনে একটার দিকে ক্যাপশনসহ একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবির ক্যাপশনে লেখেন, ‘তুমি কে? আমি কে? বাঙালি, বাঙালি। তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা।’
পরবর্তীতে রাত ১টা ১৫ মিনিটে তিনি আরও একটি ছবিসহ পোস্ট শেয়ার করেন। ছবির ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘একাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার। তোরা যারা রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’
সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশ, অনুমোদন ও জ্ঞাতসারে জুনাইদ আহমেদ পলকের এই তিনটি উসকানিমূলক ফেসবুক পোস্টের কারণে ১৪ ও ১৫ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগসহ আওয়ামী সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী আক্রমণ শুরু করে। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অগণিত শিক্ষার্থী আহত হয়। আহতদের চিকিৎসায় বাধাও দেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের গুরুতর জখম করা হয়। নিরীহ নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন ৫ আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
এ সময় সারা দেশে আবু সাঈদসহ ১ হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয় এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে গুরুতর জখমসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘটন করা হয়। যা আসামিদের নির্দেশ বা জ্ঞাতসারে বা সুযোগ তৈরি করে দেওয়া মতে সংঘটিত হয়েছে।
আসামি সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয় ও আসামি জুনাইদ আহমেদ পলক তাদের অধীনস্থদের অপরাধ সংঘটনে বাধা প্রদান করেননি বা অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
দুই. শেখ হাসিনা ও আসামি সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের আদেশ, নির্দেশ, অনুমোদন ও জ্ঞাতসারে আসামি জুনাইদ আহমেদ পলক ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে লেথাল ওয়েপন ব্যবহারসহ আন্দোলনকারীদের নিজেদের মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের আটক, নির্যাতন ও হত্যার নির্দেশ কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে ও পরে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেন। এরপর ইন্টারনেট বন্ধ-সংক্রান্ত মিথ্যা বিবৃতি প্রদান করেন এবং ব্রডব্যান্ডসহ সব ধরনের ইন্টারনেট সেবা এবং ফেসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বেশ কয়েকটি অ্যাপস (ক্যাশ সার্ভারসহ) বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর নিকট জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহ চিত্র আড়াল করে সারা দেশে সংঘটিত হত্যা, হত্যা প্রচেষ্টা, নির্যাতন এবং অন্যান্য অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন।
ইন্টারনেট বন্ধের ষড়যন্ত্র ও সিদ্ধান্ত আসত আসামি সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে। তিনি তার মা শেখ হাসিনার সঙ্গে পরামর্শ করে ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন এবং তা আসামি জুনাইদ আহমেদ পলক বাস্তবায়ন করেন। ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই সালমান এফ রহমানের সঙ্গে এক কথোপকথনে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, কতটুকু অঘটন ঘটতে পারে সেটার একটা বার্তা আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের পরিষ্কারভাবে দেওয়া উচিত এবং সেটা কালকে অ্যাডভাইজার মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করছি, উনি তো সবগুলো টেকনোলজি সম্পর্কে একদম লেটেস্ট সবকিছু জানেন, তো সেটা জেনে উনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি কালকে রাতে রিকোয়েস্ট করেছিলাম, উনি কথা বলেছেন। তখন আমাকে বলছে যে, তুমি লিস্ট পাঠাও কোন কোনটা আপাতত তুমি চাচ্ছো ব্লক রেখে আমাদের পসিবলটা করার। আমি লিস্ট পাঠিয়েছি, উনি ৮টা অ্যাপ্রুভ করে দিয়েছেন। এখন উনি বলেছেন তুমি রেডি থাকো তোমার পসিবল সবকিছু সক্ষমতা নিয়ে, যখন মা বলেন সিগন্যাল ইয়েস, তখন ওপেন, যখন বলবে নো, তখন ব্লক, এই বন্ধ।
জয়ের আদেশ, নির্দেশ, অনুমোদন ও জ্ঞাতসারে পলক শেখ হাসিনার অন্যতম সহযোগী হয়ে উল্লেখিত হত্যাকা-ের নির্দেশ বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য ১৪ ও ১৫ জুলাই দেশের পাঁচটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এবং ১৬ জুলাই থেকে দেশের ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিটিআরসির মাধ্যমে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেন।
আর ২৮ জুলাই এনটিএমসির মাধ্যমে ফেসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বেশ কয়েকটি অ্যাপস (ক্যাশ সার্ভারসহ) বন্ধ করেন এবং ১৮ জুলাই সন্ধ্যা থেকে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য তার অধস্তন বিটিআরসি ও বিএসসিপিএলসি কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ আইটিসি (ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল) অপারেটরদের তাদের আপস্ট্রিম ব্যান্ডউইথ বন্ধ করার নির্দেশ প্রদান করেন এবং বিএসসিপিএলসি কর্তৃপক্ষ তাদের কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর সাবমেরিন ক্যাবলের ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে আপস্ট্রিম সার্ভিস বন্ধ করেন। উল্লেখিতভাবে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়ে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার পারস্পরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। তারা মোবাইল সিম ব্যবহার করে কথা বলতে বাধ্য হন। ফলে তাদের অবস্থান এবং পরিকল্পনা সহজে শনাক্ত করে ব্লক রেইডের মাধ্যমে সারা দেশে গ্রেপ্তার ও দমনাভিযান অব্যাহত থাকে।
আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ, বিজিবি, সশস্ত্র যুবলীগ ও ছাত্রলীগ এবং ১৪ দলীয় জোটের ক্যাডাররা মারণাস্ত্র ব্যবহার করে গুলি করে আন্দোলনকারীদের হত্যা, জখম, নির্যাতন ও আটকের মাধ্যমে আন্দোলন নির্মূলের প্রচেষ্টা চালায়।
পূর্বঘোষিত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি প্রতিহত করতে, তাদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ করতে এবং আক্রমণের নৃশংসতা বিশ্ববাসীর নিকট আড়াল করতে আসামি জুনাইদ আহমেদ পলকের নির্দেশে বিটিআরসি ও বিএসসিপিএলসি পুনরায় সারা দেশের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। সেই সঙ্গে তিনি শেখ হাসিনার উল্লিখিত কর্মকা-ে সহায়তা করেছেন এবং সম্পৃক্ত থেকেছেন।
এ সময় সারা দেশে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে গুরুতর জখম করা হয়েছে। নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর এই আক্রমণ চালানো হয়েছে ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে, হেলিকপ্টার উড্ডয়ন করে এসএমজি ও চায়না রাইফেলসহ অন্যান্য মারণাস্ত্র থেকে গুলি করে। এমনকি মৃত্যুর পর অনেকের লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে, আহতদের চিকিৎসা প্রদানে বাধা দেওয়া হয়েছে, চিকিৎসকদের মৃত্যুর কারণ পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে, নিহতদের অনেককে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে, দাফনে বাধা প্রদান করা হয়েছে। এমনকি হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ফেলার মতো অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। জনগণ যাতে উল্লিখিত হত্যাকা- ও নির্যাতন সম্পর্কে জানতে না পারে, সে জন্য এবং উল্লিখিত হত্যাকা- ও নির্যাতন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে আসামি জুনাইদ আহমেদ পলক মৌখিক এবং এসএমএসের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেন। যার ফলে সারা দেশে মানুষ হত্যা ও নির্যাতন ত্বরান্বিত হয়। যা ছিল ব্যাপক মাত্রায় পদ্ধতিগতভাবে লক্ষ্য নির্ধারণপূর্বক সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ। আসামি সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয় ও আসামি জুনাইদ আহমেদ পলক তাদের অধীনস্থদের অপরাধ সংঘটনে বাধা প্রদান করেননি বা অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
এরই ধারাবাহিকতায় উল্লিখিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে আসামি সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয় এবং জুনাইদ আহমেদ পলকের আদেশ বা নির্দেশ বা অনুমোদন বা জ্ঞাতসারে দেশব্যাপী ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করার মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর নিকট জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহ চিত্র আড়াল করে/ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অর্থাৎ বিজিবি ও পুলিশ ঢাকা মহানগরের বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁও ও হাতিরঝিল থানা এলাকায় ১৯ জুলাই গঙ্গাচরণ রাজবংশী (৫৬), রাসেল মিয়া (৩২) সহ ২৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে এবং বহু সংখ্যককে গুরুতর জখম করে। যা আসামিদের নির্দেশ বা জ্ঞাতসারে বা সুযোগ তৈরি করে দেওয়া মতে সংঘটিত হয়েছে।
তিন. এরই ধারাবাহিকতায় উল্লিখিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে জয় এবং পলকের আদেশ বা নির্দেশ বা অনুমোদন বা জ্ঞাতসারে দেশব্যাপী ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করার মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর নিকট জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহ চিত্র আড়াল করে ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে মারণাস্ত্র ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করেও আন্দোলন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এবং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি প্রতিরোধের মরিয়া প্রয়াস হিসেবে ঢাকার উত্তরা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী সশস্ত্র ক্যাডারদের দ্বারা ৫ আগস্ট শিশু জাবির ইব্রাহীম (৬), সামাউল আমান নুরসহ ৩২ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং বহু সংখ্যককে গুরুতর জখম করা হয়। যা আসামিদের নির্দেশ বা জ্ঞাতসারে বা সুযোগ তৈরি করে দেওয়া মতে সংঘটিত হয়েছে। এ মামলায় চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করা হয়।
জবানবন্দিতে মেসবাহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, জুলাই আন্দোলনে আমি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ছিলাম। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, জুনাইদ আহমেদ পলকের স্ট্যাটাস, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের কর্মকা- এবং আওয়ামী রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কর্মসূচি প্রদান করি। ওই দিন সকাল ১০টায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে আমরা জমায়েত হই। আমাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠিত করা এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যে কর্মকা- করেছে তার বিচার করা। সেদিন বাড্ডা থানার পুলিশ আমাদের বারবার বাধা প্রদান করে। বিকেল আনুমানিক ৪টা পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলমান ছিল। কর্মসূচি শেষ করে আমি বাসায় ফিরে জানতে পারি যে, সেদিন সারা দেশে ছয়জন শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছে।
১৮ জুলাইয়ের কর্মসূচি নিয়ে মেসবাহ বলেন, আমাদের পরবর্তী কর্মসূচি ছিল ১৮ জুলাই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। ওই দিন আনুমানিক সকাল ১০টায় আমাদের কর্মসূচি শুরু হয়। আমাদের কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ আমাদের বাধা দেওয়া শুরু করে। আমরা পুলিশের কথায় কর্মসূচি প্রত্যাহার না করায় পুলিশ প্রথমে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এরপর তারা আমাদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে। ওই সময় আমার মেরুদ-ে সমস্যা থাকার কারণে আমি ক্রাচ ব্যবহার করছিলাম। আমি আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলাম। পুলিশের লাঠিচার্জ সত্ত্বেও আমি আমার অবস্থান থেকে সরিনি। পুলিশ আমার ওপরও লাঠিচার্জ করে এবং আমার ওপর লাঠিচার্জ করেই তাদের আক্রমণ শুরু করে। লাঠিচার্জের পরে পুলিশ রাবার বুলেট এবং শটগানের গুলি করতে থাকে। তাদের আক্রমণে ছাত্রছাত্রীরা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে গেট বন্ধ করে দিলে পুলিশ গেটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে গুলি করতে থাকে এবং টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে থাকে। ওই দিন পুলিশের হামলায় ওই এলাকায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০-২৫০ জন ছাত্রছাত্রী আহত হয়। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হয়। ওই দিন ইম্পেরিয়াল কলেজের ছাত্র জিল্লুর শেখ পুলিশের গুলিতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শহীদ হন। যারা আহত হয়েছিল, তারা পুলিশের লাঠিচার্জ, ছররা গুলি এবং টিয়ারশেলে জখম হয়। আমার বন্ধু জিসানের চোখে ছররা গুলি লেগেছিল এবং তার চোখ নষ্ট হয়ে যায়। আহতদের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে এবং আশপাশের হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছিল। ওই দিন আন্দোলন শেষে আমি আমার নিরাপত্তার কারণে আমার বন্ধুর মেসে উত্তর বাড্ডায় চলে যাই। আমার বাড়িতে যুবলীগের হামলার আশঙ্কা ছিল, সেজন্য আমি বন্ধুর মেসে চলে যাই।
ইন্টারনেট বন্ধ নিয়ে তিনি বলেন, ১৮ জুলাই দিবাগত রাতে আবিষ্কার করি, আমাদের মোবাইল ফোনগুলোতে ইন্টারনেট কাজ করছে না। তখন আমরা বুঝতে পারি যে, সরকারের নির্দেশে এই রকম হয়েছে। এর পূর্বেও কয়েকবার ইন্টারনেট স্লো করা হয়েছিল। ইন্টারনেট না থাকার কারণে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমাদের নিজেদের মধ্যেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আমাদের এই আন্দোলন ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়ন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এই আন্দোলনে পুলিশ, বিজিবি, আওয়ামী লীগের সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণে সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন শহীদ হন। প্রায় ২৫ হাজার মানুষ আহত হন।
৫ আগস্টের পর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি যে, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আরেকজন ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে কথোপকথন করেছিলেন। ওই আরেকজন ব্যক্তি সম্ভবত সালমান এফ রহমান। তাদের কথোপকথনের প্রতিপাদ্য ছিল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া। ওই কথোপকথন থেকে জানতে পারি, শেখ হাসিনার নির্দেশে, সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরামর্শে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল। ইন্টারনেট বন্ধের উদ্দেশ্য ছিল, তৎকালীন সরকারের হামলার ফলে আন্দোলনকারীদের নিহত ও আহত হওয়ার সংবাদ যাতে বহির্বিশ্বে এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রচারিত হতে না পারে। এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের মধ্যকার যোগাযোগ বন্ধ করার মাধ্যমে আন্দোলনের গতি কমিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেও ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল।
আমি এই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতির জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, জুনাইদ আহমেদ পলক, সালমান এফ রহমান, আরাফাতসহ শেখ হাসিনার অধীন সব ব্যক্তির বিচার দাবি করেন মেসবাহ উদ্দীন আহমেদ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button