সাগর পথে মানবপাচার রোধ করতে হবে

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ নিরীহ লোকদের ফ্রি ভিসা বা কোনো ধরনের শ্রম চুক্তিপত্র ছাড়াই ভালো চাকরি, বিয়ের সুযোগসহ নানান সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে, বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় ট্রলারে করে সমুদ্রপথে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ যেমনÑসৌদি আরব, লেবানন, বাহরাইন প্রভৃতি দেশে পাঠানো হয়। নানা ধরনের উদ্যোগ ও তৎপরতা সত্ত্বেও মানবপাচার রোধ হচ্ছে না- যা উদ্বেগজনক। খবরে প্রকাশ, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাগরপাড়ের ইউনিয়ন বাহারছড়া এখন মানবপাচারের প্রাণকেন্দ্র। সাম্প্রতিক সময়ে মানবপাচারে আবার আশঙ্কাজনকভাবে গতি ফিরেছে। কক্সবাজারের সাগরপথে মানবপাচারের এই গতির কারণ হিসেবে জানা যায়, ঘটনাগুলো কিছুটা মৌসুমি এবং কিছুটা বৈশি^ক। বর্ষা মৌসুমে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকে। বর্ষা বিদায়ের পর নভেম্বর মাস থেকে কক্সবাজারের উপকূল দিয়ে পাচারের বাজার রমরমা হয়ে ওঠে। ফলে, এই বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে মানবপাচার রোধে তৎপর হতে হবে। উল্লেখ্য, বৈশি^ক পরিস্থিতি যখন প্রতিকূলে থাকে, তখন আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র ঘাপটি মেরে থাকে। মানবপাচারের বিষয় নিয়ে নানা দেশে যখন মাতামাতি বেশি হয়, তখন পাচারকারীরা একপ্রকার চুপসে যায়। আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাংলাদেশকেন্দ্রিক পাচারও বেড়ে যায়। শুধু কক্সবাজার সমুদ্রপথ নয়, বিশে^র বিভিন্ন দেশে অবৈধ গমনে অনেক বাংলাদেশি সর্বস্বান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। উন্নত জীবনের আশায় দাদালদের খপ্পরে পড়ে নানা প্রলোভনে সর্বস্ব হারিয়েছে অনেকে। মানবপাচার বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা। কেননা, জল-স্থল-আকাশপথে বিভিন্নভাবে মানবপাচার চলছে। মূলত জীবন ও জীবিকার কারণে, দারিদ্র্যের পীড়নে মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। এসব মানুষের বেশিরভাগই প্রতারিত হচ্ছে। অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাপথে মারা যাচ্ছেন। এমন মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে সাগর পথে বিদেশে পাড়ি জামাতে নৌকাডুবিতেও প্রাণ হারিয়েছে মানুষ। মানবপাচারের শিকার হওয়ার পর বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন অনেকে; যাদের অনেকে অমানুষিক নির্যাতনেরও শিকার হয়েছেন। যতই সচেতনতামূলক প্রচারণা হোক না কেন, জীবিকার মানোন্নয়ন ছাড়া মানব পাচার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশে এখনো বেকার তরুণ ও যুবকের সংখ্যা অনেক। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগায় দেশি-বিদেশি মানবপাচারকারী চক্র। উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিবছর শত শত তরুণ-যুবকের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। অনেককে জিম্মি বানিয়ে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে কিছু দালাল ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। মানবপাচারের বেশির ভাগ মামলার বিচার ও তদন্ত কার্যক্রম শেষ করতে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। যে-সব মামলা আলোর মুখ দেখেছে, সেগুলোর বেশির ভাগই বিচারাধীন। মানবপাচার ঠেকাতে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ পদক্ষেপ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পাচারকারীদের শনাক্ত ও অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
