কর্ণফুলী নদী: দেশের অর্থনীতির হৃৎপি-ের সংকট

প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক দিক থেকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী হল কর্ণফুলী। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, যা প্রায় ৮৫% আমদানি ও ৮০% রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনা করে, এই নদীর তীরে অবস্থিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই নদী এখন দখল, দূষণ ও ভরাটের কবলে পড়ে চলছে, যার ফলে মৎস্য সম্পদ কমছে, নাব্যতা হারাচ্ছে এবং খালকেন্দ্রিক নৌপরিবহণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কর্ণফুলী নদী যে শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। এই নদী বন্দরকে নাব্যতা প্রদান করে, যা বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ, স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, নদীর শাখা খাল ও প্রধান পথের দূষণ ও ভরাটের ফলে বর্তমানে এই নদী তার প্রাকৃতিক চেহারা হারিয়ে ফেলছে। চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া জানান, নদীর নাব্যতা হারানোর কারণে বন্দর এবং নৌপরিবহণ ব্যবস্থা সংকটে পড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কর্ণফুলীর প্রস্থ প্রায় ৩০০ মিটার পর্যন্ত কমেছে। এছাড়া, পলি জমে যাওয়ার কারণে জাহাজ তীরে ভিড়তে পারছে না, যার ফলে পণ্য ওঠানামার জন্য অতিরিক্ত পন্টুন ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি, কর্ণফুলী নদী প্রতিদিন নানা ধরনের বর্জ্যে ভরে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম নগরের শিল্পকারখানা গুলি থেকে তরল বর্জ্য নদীতে পড়ছে, সাথে যোগ হচ্ছে গৃহস্থালি ও অন্যান্য বর্জ্য। এতে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ছে এবং মৎস্য সম্পদ বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে কর্ণফুলী নদীর দূষণের কারণে ৩৫ প্রজাতির মাছের বিলুপ্তি এবং অন্যান্য মাছের প্রজাতির হুমকির কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য, সিমেন্ট পাউডার, নৌকা এবং জাহাজের তেল এবং অন্যান্য দূষণকারী উপাদান নদীর প্রাণপ্রবাহকে বিপন্ন করছে। চট্টগ্রাম বন্দর, যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে যদি নদীটির দূষণ ও দখল বন্ধ না করা হয়। তাহলে, কর্ণফুলী নদীকে বাঁচানো এবং তার গুরুত্ব পুনরুদ্ধার করা, শুধুমাত্র পরিবেশ সংরক্ষণই নয়, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধির জন্যও অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত, এই নদী রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে চট্টগ্রাম বন্দর তার পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারে এবং জাতীয় অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে।
