স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকল্পসমূহে দুর্নীতির চিত্র

বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার উপস্থাপিত তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিরোজপুর জেলায় বাস্তবায়িত ১৭টি প্রকল্পে দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭টি প্রকল্পের মোট স্কিম সংখ্যা ১,৮১০টি এবং চুক্তিমূল্য ছিল ৩,৫৫৮.৯২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ৩,১৭৬.৫৮ কোটি টাকা ছাড়কৃত হলেও প্রকৃতপক্ষে সম্পন্ন হওয়া কাজের মূল্য ১,৫২৯.১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ১,৬৪৭.৪৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা দেশের জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের অপচয়েরই নামান্তর। তদন্ত প্রতিবেদনে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মে জড়িত ১১ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উঠে এসেছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষক, প্রকল্প পরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা। এ ছাড়াও, পিরোজপুর-১ ও পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্নীতির এই চিত্র শুধু প্রশাসনিক স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও এতে জড়িত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে বিল পরিশোধের সুবিধা নিয়েছে। পাশাপাশি, পিরোজপুর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারের কার্যালয়ের কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বেশ কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানসমূহকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে। পিআরএল ভোগরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব সরকারি পাওনা স্থগিত করা হয়েছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) এর কাছে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠেÑএ ধরনের দুর্নীতি প্রতিরোধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? দুর্নীতির কারণে দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ব্যাহত হচ্ছে, জনগণের করের টাকা লুটপাটের শিকার হচ্ছে, অথচ দুর্নীতিবাজরা বহাল তবিয়তে থেকে যাচ্ছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু সাময়িক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করতে সাহস না পায়।
